‘বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়’ শীর্ষক আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ানের পরিবর্তে বাজেটে মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিগত সময়ে কাঠামোর অনুকরণেই বাজেট প্রণীত হয়েছে। শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের কিছু তারতম্য হয়েছে মাত্র। এ ছাড়া ঋণের সুদ পরিশোধে প্রাধান্য দিয়ে দেনার গ্লানি ঘোচানোর বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে বাজেটে। সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এ বছরের বাজেট যেন আয়-ব্যয়ের ধারাপাত।
গতকাল সোমবার জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্যমে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট। জাতীয় সংসদ না থাকায় এবং অর্থবছরের এ সময়ে বাজেট পেশের বাধ্যবাধকতা থাকায় টেলিভিশনে বাজেট পেশ করা হয়। এর আগে বিগত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময়ে এভাবে বাজেট পেশ করেছিলেন ওই সময়ের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
অর্থ উপদেষ্টা আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রাক্কলন করেছেন ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। এর বিপরীতে সরকারের আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে গতানুগতিকভাবে দেশীয় উৎস থেকেই বেশি অর্থের সংস্থান করা হবে। ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থান করা হবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণ ও সঞ্চয়পত্র থেকে। এর মধ্যে শুধু ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা নেওয়া হবে সঞ্চয়পত্র থেকে। তাছাড়া বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৪ শতাংশের নিচে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরেই থাকবে। সেখানে সরকার আগামী অর্থবছর ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হচ্ছে বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু আগামী এক বছরে ঘোষিত বাজেটের আওতায় সুনির্দিষ্টভাবে কী কী সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই কমবেশি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাজেটে মাত্র সাতটি খাতের সংস্কারের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার, ভূমি আইন ও ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কার, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, আর্থিক খাতের পুনর্গঠন ও সংস্কার এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সেবার উন্নয়ন। তবে এসব সংস্কারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা তুলে ধরা হয়নি। আগামী এক বছরের সংস্কারের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ কী উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো বর্ণনা নেই বাজেটে। বরং এসব ক্ষেত্রে বিগত দিনে যেসব সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; যেন আয়-ব্যয়ের ধারাপাত। এর বাইরে সাম্প্রতিককালে জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কীভাবে নিরসন করা হবে সে বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় কোনো ইঙ্গিত নেই। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যে প্রতিষ্ঠানের, সেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে এখনো জটিলতা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়েও কিছু উল্লেখ নেই বাজেটে।
এবারের বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে দেশের মোট জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর বিপরীতে রাজস্ব আহরণ প্রাক্কলন করা হয়েছে মোট জিডিপির ৯ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জিডিপির যেসব অনুমিতির ওপর ভিত্তি করে এসব প্রাক্কলন করা হয়েছে, সেগুলোর হিসাবে ত্রুটি থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ওপর সরকার প্রভাব বিস্তার করে জিডিপির হিসাব বাড়িয়ে দেখাত বলে বিভিন্ন সময় উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এ সরকার অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়নে যে শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জিডিপির হিসাব প্রাক্কলনে ত্রুটি আছে। কিন্তু ত্রুটির বিষয়টি চিহ্নিত করলেও বর্তমান সরকার পরিসংখ্যানের ত্রুটি সংশোধনে কোনো উদ্যোগ নেইনি। বরং সেই ত্রুটিপূর্ণ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করেছে। ফলে এ বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়েও থাকছে সংশয়।
তাছাড়া বরাবরের মতোই এনবিআরের সক্ষমতা বিবেচনা না করে সংস্থাটির ওপর ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর প্রস্তুত কি না, সে বিষয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। তাছাড়া এনবিআর সংস্কার করা নিয়ে গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সংস্থাটিতে অসন্তোষ চলছে। সেই অসন্তোষ এখনো মেটেনি। এনবিআর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। এমনকি গতকাল বাজেট ঘোষণার সময়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলে সেটি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ঘাটতি অর্থায়নেও সরকার হাঁটছে গতানুগতিক পথে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এভাবে সরকার যদি ব্যাংক খাতের ওপর বেশিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ হ্রাস পাবে, যা প্রকারান্তরে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের দাবিতে। দেশের বেসরকারি খাত শ্রমবাজারে প্রবেশ করা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারায় সবাই সরকারি চাকরির মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কোটা ব্যবস্থার কারণে সরকারি চাকরিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। এ বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যেই আন্দোলনে নেমেছিলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আগামী অর্থবছরের কত মানুষের কর্মসংস্থান হবে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষেপণ বাজেটে নেই। সরকারি, বেসরকারি ও বৈদেশিক খাতে আগামী এক বছরে কত মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে, সে বিষয়ে বাজেটে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
এ বাজেট প্রণয়নের আগে বিভিন্ন খাতের মানুষের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সেসব আলোচনায় তিনি যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন, তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের মধ্যে এ মূল্যস্ফীতি কোন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে, সে বিষয়ে কোনো প্রক্ষেপণ নেই বাজেটে।
একসময় বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত ছিল শিক্ষা। কিন্তু ধীরে ধীরে সরকারের প্রাধিকার স্থানান্তরিত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ধীরে ধীরে ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়তে থাকে। আর এসব অবকাঠামো বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি নানা উৎস থেকে অনেক বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। এসব ঋণের মধ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় ঋণও ছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেসব ঋণ পরিশোধের সময় হয়েছে। ফলে বর্তমানে বাজেটের খাতভিত্তিক ব্যয়ে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হিসেবে স্থান দখল করে নিয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ। আগামী অর্থবছরের জন্য ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব ঋণের ঘানি আরও অনেক দিন টানতে হবে জাতিকে।
একদিকে ঋণের সুদ বৃদ্ধি, অন্যদিকে সরকারের অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। ফলে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে রাজস্ব আহরণ হয়, তার প্রায় পুরোটাই চলে যায় পরিচালন ব্যয় মেটাতে। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের হাতে উদ্বৃত্ত কোনো অর্থ থাকে না। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় পুরোটাই হয়ে পড়ছে ঋণনির্ভর। আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে সরকার তার রাজস্ব আয় থেকে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা দিতে পারবে উন্নয়ন খাতে। বাকি পুরোটা আসবে ঋণ থেকে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে সরকারি ব্যয়ের যেসব নতুন খাত সৃষ্টি হয়েছে এবং যেসব অযৌক্তিক ব্যয়ের খাত সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় সংকোচনের বিষয়ে কোনো ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাজেটে লক্ষ করা যায়নি। ফলে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের যে আকাক্সক্ষা নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তা অর্জিতই থেকে যেতে পারে।