বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আস্থা ভোটের বিধান চালুর পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের মতে, সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এই বিধান অপরিহার্য। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্বিতীয় ধাপের বিষয়ভিত্তিক সংলাপে এ প্রস্তাব উঠে আসে। সংলাপে ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।
আস্থা ভোট নিয়ে বিএনপি ও এনসিপির প্রস্তাব : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদে আস্থা ভোটের বিধান না থাকলে সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে না। বারবার সরকার পরিবর্তনের প্রবণতা সৃষ্টি হবে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি জানান, আস্থা ভোট, অর্থবিল, এবং সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় ৭০ অনুচ্ছেদে আস্থা ভোটের বিধান যুক্ত করার সুপারিশও করেন তিনি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিধান প্রয়োজন, তবে সরকারের স্থিতিশীলতাও অপরিহার্য। তাই আস্থা ভোট বাধ্যতামূলক করা উচিত।’
ভিন্ন মত ও আরও আলোচনার প্রস্তাব : গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। আস্থা ভোট চালু রেখে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়তে হবে।’
তিনি এ বিষয়ে আরেকটি সংলাপের প্রস্তাব দেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও আলোচনা প্রয়োজন। সব দলের মতামতের ভিত্তিতে জুলাইয়ে জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি হবে।’
গতকালকের সংলাপে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, নারীদের সংরক্ষিত আসন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ও কার্যপরিধি নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল বিএনপি, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, এলডিপি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, জাকের পার্টি, ১২-দলীয় জোট, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী ঐক্যজোট।
সভাপতিত্ব করেন আলী রীয়াজ। উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য মো. আয়ুব মিয়া, সফর রাজ হোসেন, বদিউল আলম মজুমদার, এমদাদুল হক, ইফতেখারুজ্জামান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা এমন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে চাই, যেখানে সব দল ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। এই ঐকমত্য জুলাইয়ে একটি জাতীয় সনদে রূপ দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব হলেও প্রতিটি দল তাদের ইশতেহার ও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখবে। তবে অতিরিক্ত প্রস্তাব যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। আমরা শুধু সেই প্রস্তাবগুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত করব, যেগুলোতে সবার সম্মতি থাকবে। সম্মিলিত সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক যুক্তি-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি কাঠামো গড়তে চাই।’
তিনি আরও বলেন, “সব বিষয়ে ঐকমত্য না হলেও, সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় কিছু উপসংহারে পৌঁছাতে হবে। জুলাইয়ের মধ্যে সনদ চূড়ান্ত করাই আমাদের লক্ষ্য। যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো ‘আলোচিত হলেও সম্মতি পাওয়া যায়নি’ হিসেবে উল্লেখ করা হবে।”
নারীদের সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিএনপির অবস্থান : জাতীয় সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে ১০০ তে উন্নীত করার প্রস্তাবে বিএনপি সম্মতি জানালেও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগে নারীদের সংরক্ষিত আসন ছিল ৩০, পরে ৪৫ এবং সর্বশেষ সংশোধনের মাধ্যমে ৫০ করা হয়েছে। বর্তমানে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে আসন বণ্টন হচ্ছে। আমরা আরও ৫০টি আসন বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছি এবং অধিকাংশ দল এতে সম্মত। তবে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। এ বিষয়ে পরে আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সংসদীয় সংস্কৃতিতে সরাসরি বা ঘূর্ণায়মান নির্বাচন পদ্ধতি এখনো কার্যকর মনে হয় না। নারী, শিশু, শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য বিশেষ বিধান থাকা উচিত। নারীসমাজকে ক্ষমতায়িত করতে সাংবিধানিক ও আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন : সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, প্রথম ধাপের আলোচনায় বেশিরভাগ দল কয়েকটি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের জন্য দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। এটি সংসদে জবাবদিহিতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত করবে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে প্রাথমিক ঐকমত্য হয়েছে, তবে কোন মন্ত্রণালয় ও কতগুলো পদ হবে, তা সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
তিনি বলেন, শুধু বৃহৎ বিরোধী দল নয়, ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্বও বিবেচনা করতে হবে। ৫ বা ১০ সদস্যের দলগুলোর প্রতিনিধিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করা হবে।