ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নে বদলে যেতে পারে ঢাকা

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ‘ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি)’ প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য ‘টিওডি প্ল্যানিং অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন ইউজিং ল্যান্ড রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যান্ড রিডেভেলপমেন্ট টুলস’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা চলছে জাপানের টোকিও শহরে। কর্মশালায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, বিআরটিসি এবং মেট্রোরেল প্রকল্পের কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কর্মশালা শেষ হবে। কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার রাজউক ভবনে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফয়সাল খান

দেশ রূপান্তর : জাপানে ‘টিওডি প্ল্যানিং অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন ইউজিং ল্যান্ড রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যান্ড রিডেভেলপমেন্ট টুলস’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ থেকে দেশে ফিরেছেন। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে এ প্রশিক্ষণ বা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি কী কাজে আসতে পারে?

ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম : ১৯৪৫ সালে জাপান ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ। তারা ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ১৯৫০ সালে। তারা এ পরিকল্পনার ওপর আইন ও বিধিও তৈরি করেছে। পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনা ও বিধিগুলো কার্যকর করে যাচ্ছে। ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নে টোকিও এবং এর আশপাশের শহরের চিত্র বদলে গেছে। ৭৫ বছরে তারা পরিকল্পনার প্রায় ৭০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। আমাদের ঢাকা শহরেও ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন করা যেতে পারে। তারা উত্তরা ও গাবতলীকে বেছে নিতে বলেছে। তাদের উন্নয়নের এ মডেলের ওপরই আমাদের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আপনার কাছে জাপানের ও আমাদের উন্নয়ন দর্শনের পার্থক্য কী মনে হয়েছে?

রিয়াজুল ইসলাম : যে এলাকায় মানুষ বেশি চলাচল করে, আমরা সেখানে মেট্রোরেল তৈরি করছি। তারা আগে মেট্রোরেল তৈরি করেছে, পরে সেখানে বসতি হয়েছে। টোকিও শহরের বাড়িগুলোয় মেট্রোরেল স্টেশন থেকে হেঁটে যেতে ৮ থেকে ১০ মিনিটের বেশি লাগে না। আমাদের এখানে এভাবে মেট্রো তৈরি করা যাবে না। এখানে মেট্রো স্টেশনের সঙ্গে বাসের সংযোগ থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : তাদের প্রস্তাব নিয়ে কী চিন্তাভাবনা করছেন?

রিয়াজুল ইসলাম : জাপানে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, প্রাথমিকভাবে বেগম রোকেয়া সরণি থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : প্রকল্পে কী কী থাকবে?

রিয়াজুল ইসলাম : অনেকগুলো মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাট হবে, বিল্ডিং হবে, পার্ক হবে, গ্রিন জোন হবে, শপিং মল হবে, খোলা জায়গা থাকবে; বাসযোগ্য শহরে যত ফ্যাসিলিটি থাকার কথা, সবই থাকবে। মেট্রো স্টেশনকে ঘিরে এসব তৈরি করা হবে।

দেশ রূপান্তর : পুরান ঢাকার ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে মিল আছে কি?

রিয়াজুল ইসলাম : ব্লক হচ্ছে একটা বিন্দু আর টিওডি হচ্ছে সিন্ধু। ঢাকার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বড় শহর টোকিও। পুরো টোকিও শহরকে টিওডির আওতায় আনা হয়েছে। ওদের অনেক মেট্রোরেল আছে, বেশিরভাগই আন্ডারগ্রাউন্ড। যাতায়াত ব্যবস্থাসহ সুন্দর সব ব্যবস্থাই সম্ভব হয়েছে ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নের ফলে।

দেশ রূপান্তর : ঢাকার মতো ঘিঞ্জি এলাকার বাড়ির মালিকদের কীভাবে রাজি করাবেন?

রিয়াজুল ইসলাম : ১৯৫০ সালে টোকিওর অবস্থা ছিল আমাদের বর্তমান অবস্থার মতো। ঘিঞ্জি এলাকা, অপরিকল্পিত বাড়ি; দশ ফুট, ছয় ফুট আর আট ফুটের রাস্তা। এমন অবস্থায় তারা একটা একটা এলাকা বাছাই করেছে। ওই এলাকায় কাদের কাদের জমি আছে, তা খোঁজে বের করেছে। তাদের কাউন্সিলিং করে ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নের কাজ করেছে। আমরাও জমির মালিকদের বোঝাব, জায়গা দিলে আমরা ফ্ল্যাট দেব। কাজটি প্রাইভেট এজেন্সি দিয়ে করা হবে। বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। যানজট নিরসন করে, পরিবেশ রক্ষা করে বাসযোগ্য নগরী গড়াই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এটি যে এলাকায় বাস্তবায়ন হবে, সেখানে বাড়ি থেকে বের হলেই পার্ক, গ্রিন জোন ও খোলা জায়গা। একটু হাঁটলেই পাওয়া যাবে গণপরিবহন বা মেট্রোরেল। এমন সুবিধা একটি বা দুটি এলাকায় নিশ্চিত করা গেলে অন্যরাও উৎসাহিত হবেন।

দেশ রূপান্তর : জাপান জমির মালিকদের কীভাবে ম্যানেজ করেছিল?

রিয়াজুল ইসলাম : ওদের ল্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন খুব পাওয়ারফুল এবং গভর্নমেন্ট রেজিস্টার্ড। আমাদের এখানে যেমন ভুয়া কিছু অ্যাসোসিয়েশন আছে, জাপানে তেমন নেই। ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নে তাদের বড় একটা ভূমিকা আছে। আর এগুলো বাস্তবায়ন করছে প্রাইভেট সেক্টর। বিভিন্নজনকে খাতভিত্তিক অথরিটি দিয়ে দিয়েছে। তবে সবকিছুর ইমপ্লিমেন্টেশন করছে গভর্নমেন্ট। ল্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জমির মালিকদের কাছে সরকারের পরিকল্পনা উপস্থাপন করছে। জোর করে ওরা কারও জমি অধিগ্রহণ করে না। কেউ জমি দিতে না চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা দিয়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দিয়ে কীভাবে পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ি বানাবে, তাও বলে দেয়। প্রথমদিকে তাদেরও বোঝাতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু এখন মানুষ স্বেচ্ছায় জমি দিচ্ছে। ওসাকা শহরে এখনো একটি প্রজেক্ট চলমান, যেখানে প্রশিক্ষণের জন্য রাজউকের টিম রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

রিয়াজুল ইসলাম : আপনাকেও ধন্যবাদ। দেশ রূপান্তরের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।