ড. ইউনূসের অধীনেই ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় বিএনপি

চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দ্রুত ও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান আবারও জানিয়েছে বিএনপি। দলটির দাবি, নির্বাচন প্রশ্নে একটি পরিষ্কার ও গ্রহণযোগ্য পথনকশা না থাকায় দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা দ্রুত নিরসন প্রয়োজন। এ থেকে উত্তরণে আগামী সংসদ নির্বাচন ডিসেম্বরের পরে যাওয়ার কোনো কারণ দেখছে না দলটি। বিএনপি এ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত, তবে নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখতে চায় তারা।

বিএনপির নেতাদের অভিমত, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা হলেও মূল গুরুত্ব পেয়েছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং তার রোডম্যাপ। বিএনপি ছাড়াও অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দলই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দিয়েছে।

গত সোমবার গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। রাত পৌনে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বৈঠকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, বৈঠকে কমিশনের প্রধান ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘শুধুমাত্র একটি দল ডিসেম্বরে নির্বাচন চায়’ এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি। এ মন্তব্য দলটির নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে। জাপানে দেওয়া ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘আপনার এ মন্তব্য বিএনপিকে আহত করেছে।’ বৈঠকে বিএনপি নেতারা অভিমত দেন, সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও বৈঠকগুলো থেকে এখনো পর্যন্ত তারা নির্বাচনের রোডম্যাপ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক বার্তা পাননি। তাদের ভাষ্য, দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য এবং এ দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো অগ্রগতি নেই। সূত্রমতে, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বলেন, তারা এ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত, তবে নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখতে হবে।

বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নবনির্বাচিত মেয়র ইশরাক হোসেনের শপথ না নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়। বিএনপির দাবি, সরকার এ প্রক্রিয়াটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে। যদিও আপিল বিভাগ বলেছে, এটি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ অবস্থায় দলটি ইসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে মেয়র পদে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে ইশরাকের কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানায় বিএনপি।

‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের দাবিতে সচিবালয়ে চলমান আন্দোলনকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করেন, সরকার এ সংকট যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না এবং এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দলটির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিষয়টি সরকার সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না। তারা এও মনে করেন, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। ঈদুল আজহার পর আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিএনপি।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। এ বার্তাটি বিভিন্ন ফোরাম ও আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরবে বিএনপি। ঈদুল আজহার পর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দলটি পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবে।

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এমন কোনো সংস্কার নেই যেগুলো এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। আমরা মনে করি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা খুবই সম্ভব।’