আরইবি-পিবিএস অনড় ভোগান্তিতে বিদ্যুৎ গ্রাহক

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকটতর হয়ে উঠছে। দুপক্ষই অনড় অবস্থানে থেকে একে অন্যকে দোষারোপ করছে। মানববন্ধন, সমাবেশ, কর্মবিরতি প্রভৃতির পর গতকাল মঙ্গলবার থেকে গণছুটিতে গেছেন সমিতির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে গ্রাহকসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ অবস্থা চললে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় বিপর্যয় ঘটার শঙ্কা রয়েছে।

আরইবি চেয়ারম্যানের অপসারণসহ নিজেদের বিভিন্ন বঞ্চনা, জুলুম, নির্যাতন বন্ধের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হাজার হাজার কর্মী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ১৪ দিন ধরে বিক্ষোভ সমাবেশ করছেন। আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতিসহ দেশ জুড়ে এলাকাভিত্তিক নানা কর্মসূচি পালন করছেন দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মীরা।

ঝড়-বৃষ্টির এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। গতকাল থেকে আন্দোলনকারীরা গণছুটিতে থাকায় সব ধরনের মেরামত কাজ ও গ্রাহকসেবা বন্ধ হয়ে গেছে দেশের বেশিরভাগ এলাকায়। অনেক স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ। কিছু কিছু স্থানে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে হামলার খবরও পাওয়া গেছে।

তবে আন্দোলনের কোনো প্রভাব পড়ছে না দাবি করেছেন আরইবির সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) মো. আব্দুর রহিম মল্লিক। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন বিভিন্ন কারণে কোথাও বৈদ্যুতিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তা মেরামত করা হচ্ছে। যেমন : শেরপুরে দ্রুততার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, সিলেট, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গণছুটির কারণে লাইনম্যানরা কাজ করছেন না। ফলে ঝড়বৃষ্টিতে বৈদ্যুতিক লাইন বন্ধ হলে আর চালু করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ বা নিষ্পত্তি করারও কেউ নেই। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের হামলার ভয়ে বহু সমিতির অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। এভাবে চললে বিদ্যুৎবিভ্রাট আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছেন একাধিক সমিতির কর্মকর্তারা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া জোনাল অফিসে গ্রাহকরা হামলা করেছে। চট্টগ্রাম পবিস-২-এর ওয়াসা ৩৩ কেভি ফিডার ও রাঙ্গুনিয়া-১ (গোচারা) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে লাইন ফল্টের কারণে। লাইনম্যান না থাকায় লাইন চেক করে ফল্ট চিহ্নিত করে সন্ধ্যা ৭টা এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঠিক করা যায়নি। উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অফিস, হাসপাতাল, থানাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি একীভূত করা। কিন্তু এটা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এখানে কিছু আইনি বিষয়ও রয়েছে। আমাদের সময় দিতে হবে। শহীদ মিনারে বসে আন্দোলন করলে তো হবে না। তারা আরইবির চেয়ারম্যানের পদত্যাগও দাবি করেছে। শহীদ মিনারের সমাবেশ দেখে তো সরকার সিদ্ধান্ত নেবে না। জনস্বার্থে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’

জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘ন্যায্য দাবির বিষয়ে সরকার সহায়তা করতে চায়। ইতিমধ্যে একাধিক কমিটি হয়েছে। এখনো আলোচনা চলছে। তারা গোঁ ধরে বসে থাকলে তো চলবে না।’ তিনি বলেন, ‘কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝামেলা হবে না। গ্রাহককে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আন্দোলনকারীদের অন্য দাবিগুলো হলো এক ও অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরইবি-সমিতি একীভূতকরণ অথবা দেশের অন্য বিতরণ সংস্থার মতো পুনর্গঠন; মিটার রিডার, লাইন শ্রমিক ও পোষ্য কর্মীদের চাকরি নিয়মিত করা; মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করে চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল; সব হয়রানিমূলক ও শাস্তিমূলক বদলির আদেশ বাতিল এবং বরখাস্ত ও সংযুক্ত কর্মীদের অবিলম্বে পদায়ন; জনবলের ঘাটতি পূরণ ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী বোর্ড গঠন করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত করা।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনদুর্ভোগ না ঘটিয়ে ন্যায্য দাবি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি আমরা। কিন্তু বিষয়টির সমাধান না করে উল্টো আরইবির চেয়ারম্যান ও মন্ত্রণালয়ের কিছু অসৎ কর্মকর্তা আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।’

‘১৪ দিন ধরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চালিয়ে যাওয়া এ আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তারা আমাদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারকে। কিন্তু মন্ত্রণালয় বসে আছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আরইবি ও সমিতিকে একীভূত করার কথা বলা হলেও আট মাসে তা আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো আরইবির কথায় এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে মন্ত্রণালয়’, যোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনারের এ আন্দোলনে ৩৫ হাজার কর্মী যোগ দিয়েছেন। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় কর্মীরা একাত্মতা পোষণ করে কর্মবিরতি পালন করছেন। এখন সবাই গণছুটিতে গেছেন। গ্রাহকসেবা কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হলে তার দায় আরইবির। আমরা রাতারাতি সব দাবি পূরণের কথা বলছি না। এখন পূরণ করা যায় এমন দাবিগুলো এখনই বাস্তবায়ন এবং যেগুলো করতে দেরি হবে, তার একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চাই আমরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কোরবানির গরু কিনেছি আমরা। এবার শহীদ মিনারেই ঈদ উদযাপন করব।’

অ্যাসোসিয়েশনটি বলছে, সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে চলমান মামলা প্রত্যাহার ও চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহালের দাবিতে গত ২১ জানুয়ারি এবং ২৬ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা। সঙ্গে ২৮ হাজার ৩০৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়।

আরইবির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ : গ্রামাঞ্চলসহ দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আরইবি। দেশের ৪ কোটি ৮২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক ৩ কোটি ৬৮ লাখ। সারা দেশে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, ন্যায্য দাবির কথা বলতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৪০ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। ছয় হাজারের বেশি কর্মীকে নিজ এলাকা থেকে দূরের এলাকায় বদলি করেছে আরইবি। সমিতির অন্তত ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলায় ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বেশ কয়েক মাস পর তারা জামিন পেয়েছেন। উচ্চ আদালত থেকে জামিনে থাকা আটজন কর্মীর জামিন গত সোমবার নিম্ন আদালত বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তাজুল ইসলাম। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা জানান, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের একপর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে গত ২৭ আগস্ট আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ১৭ অক্টোবর ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেয় আরইবি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ৬১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে ৩৩ জেলার প্রায় দুই কোটি গ্রাহক চরম দুর্ভোগে পড়েন। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করে আন্দোলন স্থগিত করেন তারা। বিদ্যুৎ বন্ধের ঘটনার জন্য সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষমাও চেয়েছেন তারা।

তাদের অভিযোগ, স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার আগে নোটিস দেওয়া ও অন্যান্য প্রক্রিয়া মানার কথা থাকলেও আরইবি তা মানেনি।

কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষা : আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। এরপর গত বছরের ২৩ অক্টোবর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যমান পল্লী বিদ্যুৎ কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দেবে তারা। গত ২৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, এক ও অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন করে আরইবি ও সমিতি একীভূত করতে হবে। এ ব্যাপারে পরে আপত্তি জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বলা হয়।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, শুরু থেকেই আইনি পথে আন্দোলনটাকে মোকাবিলা করেনি সরকার। কমিটির প্রতিবেদনের নামে কালক্ষেপণ করা যাবে না। সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তা না করে ভোক্তাদের জন্য সংকট তৈরি করা হচ্ছে।