ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ফুটবলের 'মিনি মেসি'

ফ্রান কার্বির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেন এক অনন্য উদাহরণ—প্রতিভা আর দৃঢ় মনোবলের সম্মিলনে কী অসাধ্য সাধন করা যায়, তার জীবন্ত প্রমাণ তিনি। দীর্ঘ ১১ বছরের আন্তর্জাতিক পথচলায় ইংল্যান্ডের হয়ে ৭৭ ম্যাচ খেলেছেন কার্বি। অর্জনের ঝুলিতে আছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাও। মাঠের ভেতরে আর বাইরে নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়েও ক্যারিয়ারটিকে করেছেন স্মরণীয়।

৩১ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলা থেকে অবসর ঘোষণা করেন স্পেনের কাছে হারের এক ঘণ্টার মাথায়, গোলরক্ষক ম্যারি আর্পসের অবসরের কয়েকদিন পর। তবে যেখানে আর্পসের বিদায় ছিল হঠাৎ ও বিতর্কিত, সেখানে কার্বির সিদ্ধান্ত যেন ছিল সময়োপযোগী ও যৌক্তিক।

কার্বির দলছুট হওয়ার মূল কারণ—জাতীয় দলের কোচ সারিনা ভিগম্যান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইউরো ২০২৫-এর স্কোয়াডে জায়গা হচ্ছে না তার। তাই সিদ্ধান্তটা নেওয়াটা তার কাছে কঠিন ছিল না। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ফেলেছেন তিনি, এবার সময় হয়েছে বিদায় বলার।

কার্বির প্রতিভা নিয়ে কখনও কোনো সংশয় ছিল না। তিনি ছিলেন নারীদের ফুটবলে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ও অনন্য খেলোয়াড়। যদি না দীর্ঘস্থায়ী চোট ও অসুস্থতা বারবার তাকে ছিটকে দিত, শত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মাইলফলক নিশ্চয়ই স্পর্শ করতেন।

২০১৭ সাল থেকেই হাঁটু ও গোড়ালির চোটে ভুগছিলেন তিনি। এরপর ২০১৯ সালে ধরা পড়ে পেরিকার্ডাইটিস—হৃদয়ের চারপাশে থাকা আবরণে প্রদাহ, যা তার ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারত। এরপর ইউরো ২০২২-এর আগে ক্লান্তির কারণে বিরতিতে যেতে হয়, ২০২৩ বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি আরও একবার অস্ত্রোপচার লাগা হাঁটুর চোটে।

সাম্প্রতিক সময়েও শরীর ভালো সাড়া দিচ্ছিল না। ফেব্রুয়ারিতে নেশনস লিগে খেলতে পারেননি, এপ্রিলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের দলেও ছিলেন, কিন্তু প্রথম ম্যাচে মাঠে নামা হয়নি। কোচ ভিগম্যানের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইউরোতে আর সুযোগ নেই। তারপরেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ভিগম্যান বলেন, 'সে দারুণ খেলোয়াড়, তেমনি দুর্দান্ত একজন মানুষ। স্কোয়াডে জায়গা পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। যখনই ক্যাম্পে ছিল, নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে দলের পাশে থেকেছে। এমন সময় আসে, যখন থেমে যেতে হয়। আমি গর্বিত যে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।'

নারী ফুটবলের নতুন যুগের অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিলেন কার্বি। ২০১৪ সালে উইমেনস সুপার লিগ টু থেকে ইংল্যান্ড দলে ডাক পাওয়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি। পরের বছর বিশ্বকাপে বাজিমাত করেন, কোচ মার্ক স্যাম্পসন তাকে নাম দেন ‘মিনি মেসি’।

অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ও উইং থেকে বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিয়েছেন সৃষ্টিশীলতা, চতুরতা আর হঠাৎ ঝলক দেখিয়ে। ইউরো ২০২২ জয়ে দলের প্রতিটি ম্যাচে ছিলেন একাদশে, তরুণদের সঙ্গে মিশে হয়ে উঠেছিলেন অভিজ্ঞ কাণ্ডারি।

কোচ ভিগম্যান বলেন, 'তার ছোঁয়া, অবস্থান, খেলার মস্তিষ্ক আর সংযোগ—সবকিছু অসাধারণ। তার ক্যারিয়ার অভাবনীয়, এবং এখনও সে উইমেনস সুপার লিগে খেলছে।'

২০১৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় পাওয়ার পর সাবেক কোচ ফিল নেভিল বলেছিলেন, 'আমি আমার ১০ নম্বরকে ব্রাজিলের চেয়ে এগিয়ে রাখব।' তখনই বোঝা গিয়েছিল, কার্বির প্রভাব কতটা গভীর।

ডিফেন্ডার লুসি ব্রোঞ্জ বলেন, '১০ বছর আগে সে ‘মিনি মেসি’ নাম পেয়েছিল, এবং সেটা একদম প্রাপ্য ছিল। ইংল্যান্ডের হয়ে সে যেন আলো ছড়িয়ে খেলত। আজকের অনেক ইংলিশ খেলোয়াড়ই হয়তো স্বপ্ন দেখেছিল একদিন তার সঙ্গে খেলার।'

কার্বির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু মাঠের নয়, জীবনের মাঠেও। মায়ের মৃত্যুর পর কিশোরী বয়সে মানসিক অবসাদে ভুগে একসময় ফুটবলই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে নিজের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন, সেমিফাইনাল খেলা বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে।

ইউনিভার্সিটি অফ উইনচেস্টার তাকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অবদান রাখায় সম্মানসূচক ডিগ্রিতে ভূষিত করে। পরে আরও একাধিকবার অসুস্থতার ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছেন ইউরো ২০২২-এ।

গত বছর শরীর নিয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়েও মুখ খোলেন। এবার হাঁটুর চোট নিয়েই চেলসির নয় বছরের অধ্যায় শেষ করে ব্রাইটনে পাড়ি জমিয়েছেন, যেখান থেকে মৌসুম শেষ করেছেন ‘প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ হয়ে।

অবসরের ঘোষণায় শেষবারের মতো তিনি বললেন, 'শুধু মনে রাখো—তুমি পারো।' এই একটি বাক্যেই যেন জেগে থাকে ফ্রান কার্বির জেদ, সাহস আর অনুপ্রেরণার প্রতিচ্ছবি।