ফুটবলের ইতিহাসে কিছু দ্বৈরথ সময়ের সাথে সাথে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। ঠিক তেমনি একটি দ্বৈরথ গড়ে উঠেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং স্পেন জাতীয় দল—লা রোহার—মধ্যে।
শুরুটা ইউরো ২০০৪-এ
রোনালদোর প্রথম বড় মঞ্চে স্পেনের মুখোমুখি ইউরো ২০০৪-এ। তখন তিনি কেবল এক উদীয়মান তারকা, গায়ে ছিল ১৭ নম্বর জার্সি। সেই ম্যাচে পর্তুগাল ১-০ গোলে জিতলেও রোনালদো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। কিন্তু এটাই ছিল এক দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা।
২০১০ বিশ্বকাপে হতাশা
রোনালদোর স্বপ্নভঙ্গ ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ২০১০-এর শেষ ষোলোতে। ডেভিড ভিয়ার একমাত্র গোলে জয় পায় স্পেন। সেই ম্যাচে ইকার কাসিয়াস ছিলেন অবিচল প্রাচীর, যিনি রোনালদোর গোলের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। পরে স্পেনই হয়ে ওঠে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
ইউরো ২০১২: পেনাল্টির ট্র্যাজেডি
ইউরো ২০১২-এর সেমিফাইনালে দুই দলই শক্তিতে ছিল সমানে সমান। গোলশূন্য ড্রয়ের পর খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। কিন্তু অবাক করার মতোভাবে রোনালদো নিজের শট নিতে পারেননি—ম্যাচ শেষ হয়ে যায় তার আগে। হতাশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে তার সেই চিৎকার: “কি অবিচার!” আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
নতুন অধ্যায়: প্রতিশোধের সুযোগ
এখন, ৩৯ বছর বয়সে, রোনালদো আবার মুখোমুখি হচ্ছেন স্পেনের, নেশন্স লিগ ফাইনাল-এ। আল নাসর তারকা চান আরেকটি শিরোপা এনে দিতে পর্তুগালকে। তাঁর লক্ষ্য: নিজের কিংবদন্তি আরও একবার স্পেনের বিপক্ষে উজ্জ্বল করা—ঠিক যেমন করেছিলেন রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮-তে।
সাচোতে রোনালদোর জাদুকরী হ্যাটট্রিক
২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ড্র-তে একই গ্রুপে পড়ে স্পেন ও পর্তুগাল। একদিকে ইউরো ২০১৬’র চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল, অন্যদিকে গত দশকের ফুটবল দাপিয়ে বেড়ানো স্পেন। তবে ম্যাচের আগে স্প্যানিশ শিবিরে হঠাৎ ঝড় — কোচ হুলেন লোপেতেগিকে বরখাস্ত করে স্পেন। তাঁর বদলি হিসেবে দায়িত্ব নেন ফার্নান্দো হিয়েরো। প্রস্তুতি জর্জরিত স্পেন শিবিরের আড়ালে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন একটাই নাম — ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
মাঠে গড়ানো সেই ম্যাচ হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ ম্যাচ — নাটকীয়তা, ক্লাস, আর এক কিংবদন্তির মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক।
ম্যাচের মাত্র চতুর্থ মিনিটেই প্রথম আঘাত করেন রোনালদো। নিজের পুরনো সতীর্থ নাচো ফার্নান্দেজের ভুলে পেনাল্টি আদায় করেন। গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়ার বিপক্ষে নির্ভুল শটে বল জড়ান জালে — চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তিতে নাম লেখান তিনি।
তবে স্পেনও চুপ করে বসে থাকেনি। দলে থাকা ‘ব্রাজিলিয়ান রুট’ স্ট্রাইকার দিয়েগো কস্তা নিজের স্টাইলেই জবাব দেন। পেপে ও ফন্টেকে ছিটকে ফেলে একক প্রচেষ্টায় স্পেনকে ফিরিয়ে আনেন ম্যাচে।
প্রথমার্ধ শেষের ঠিক আগে আবারও মঞ্চে রোনালদো। ডি গিয়ার অপ্রত্যাশিত ভুলে রোনালদোর নিচু শট জালে — ২-১ এ এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে এক নতুন স্পেন। দ্রুতই ব্যবধান মুছে ফেলে। দিয়েগো কস্তার দ্বিতীয় গোল এবং নাচোর অবিশ্বাস্য লং রেঞ্জ শটে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় লা রোহা। মনে হচ্ছিল, পর্তুগালের স্বপ্ন বুঝি শেষ হতে চলেছে।
কিন্তু তখনও শেষ নাটকের বাকি। ৮৮তম মিনিটে ফ্রি-কিক পায় পর্তুগাল। বলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোনালদো নেন এক গভীর নিঃশ্বাস। স্টেডিয়াম জুড়ে নীরবতা।
তারপর... এক নিখুঁত কার্ভড শট। বল পেরিয়ে যায় দেয়াল, ডি গিয়ার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় গোলের জালে। গোল! হ্যাটট্রিক পূর্ণ! ৩৩ বছর বয়সে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েন রোনালদো। এটি ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাত।
ম্যাচ শেষে পর্তুগাল কোচ ফার্নান্দো সান্তোস বলেন,
“৩-২ তে পিছিয়ে থেকেও সে দলকে উজ্জীবিত করেছে। এই মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাস ওর জন্মগত। ও বড় বড় ম্যাচে খেলেই অভ্যস্ত — আর সেখানেই ও নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরে।
স্পেন কোচ হিয়েরো শুধু একটিই কথা বলেন:
"আপনি যখন রোনালদোর মতো খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলেন, তখন এমন কিছু ঘটতে পারে। যে দল তার মতো খেলোয়াড়কে পায়, তারা সত্যিই ভাগ্যবান।”