বাংলাদেশে করোনার তিনটি নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সে ওমিক্রন বিএ ২.৮৬ এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায় ওমিক্রনের জেএন.১ গ্রুপের দুটি ধরন এক্সএফজি ও এক্সএফসি পাওয়া গেছে। এমন অবস্থায় দেশে গত এক মাস ধরে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্ত হার ক্রমেই বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ধরনে সংক্রমণ বাড়ালেও রোগের তীব্রতা অপেক্ষাকৃত কম। ফলে উদ্বিগ্ন না হয়ে স্বাস্থ্যবিধির মেনে চলা জরুরি।
বাংলাদেশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট, বিশেষ করে ওমিক্রন এলএফ.৭, এক্সএফজি, জেএন.১ ও এনবি.১.৮.১ ধরনের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৭ মে ১৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ৬, ৩০ মে ৪৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ ও ৩১ মে ২৩টি নমুনা পরীক্ষা করে তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এ মাসের গত ১০ দিনে ২৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৫৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এ বছরের প্রথম করোনায় একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গত ৫ জুন। সেদিন ২১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজন রোগী পাওয়া যায় ও ৮১-৯০ বছর বয়সী একজন পুরুষ রোগী মারা যান। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় এ বছরের সর্বোচ্চ ১০১টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্ত হার ১৩ শতাংশ।
এমন অবস্থায় সরকারকে নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো ও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার ধরন পরিবর্তিত হতে হতে কোনো এক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা সুপার স্প্রেডার হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশে এটি দ্রুত ছড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের উপধরন বিএ ২.৮৬ শনাক্ত হয়েছে ও চালু আছে। তবে এ ধরনের এখনো রোগীর অসুস্থতা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো সক্ষমতা হয়নি। আগের মতোই আছে। কিন্তু সংক্রমণ বাড়ছে। আর সংক্রমণ বাড়লে তো অসুস্থ রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। কাজেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও করোনার টিকা নেওয়া দরকার। বিশেষ করে যেখানে রোগীরা বেশি যায়, হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাস্ক পরে কাজ করা ও সবার জন্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এতদিন নমুনা পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রয়োজন বাড়বে। সেজন্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। নমুনা পরীক্ষা বাড়াতে হবে।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনা আবার বাড়তে শুরু করেছে। করোনার ওমিক্রন ধরনের কয়েকটি উপধরন দ্বারা এবার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এই উপধরনগুলোর ছড়িয়ে পড়া বা মানুষকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা বেশি। তবে রোগের তীব্রতা তৈরির ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত কম। যেকোনো সময় এই চরিত্রের পরিবর্তন হতে পারে। বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং নানা কারণে যাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ শক্তি কম, তারাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। জনাকীর্ণ স্থানে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। জ্বর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য জ্বরের ধরনটি শনাক্ত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব করোনাসহ সব ধরনের জ্বরকে নিবিড় নজরদারিতে রাখা এবং জনসাধারণকে সময়ে সময়ে গাইড করা।
এদিকে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রেলপথ মন্ত্রণালয়, স্থল ও বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নানা ধরনের সতর্কতা জারি করেছে।
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম চীনে করোনাভাইরাস ছড়ায়। এর দুই মাস পর তা বাংলাদেশেও দেখা দেয়।
মে মাসে শনাক্ত ৯.৫১% : আইইডিসিআর জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত কভিড-১৯ সার্ভিল্যান্স থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক মাসে কভিড-১৯ সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আইইডিসিআর পরিচালিত ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিল্যান্স, বাংলাদেশ ও আইইডিসিআর পিএইচওসির মাধ্যমে গত মে মাসে ১ হাজার ৪০৯ জন সম্ভাব্য কভিড-১৯ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ১৩৪ জন বা ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ রোগীর কভিড-১৯ শনাক্ত হয়, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ হার। এ ছাড়া ২০২৩ সালের মে-আগস্ট এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত কভিড-১৯ সংক্রমণের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি ছিল।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, কভিড-১৯ পজিটিভ নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ওমিক্রন বিএ ২.৮৬ শনাক্ত হয়েছে, যা আগেও বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছিল।
এমন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। আইইডিসিআর বলেছে, মাস্ক ব্যবহার করুন। যথাসম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করুন (সাবান পানি অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে)। আপনার যদি জ্বর/ কাশি/শ্বাসকষ্ট থাকে তবে সুস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে থাকুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কাশি শিষ্টাচার মেনে চলুন। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু দিয়ে বা বাহুর ভাঁজে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন, সঙ্গে সঙ্গে ঢাকনা যুক্ত পাত্রে টিস্যু ফেলে দিন এবং হাত পরিষ্কার করে ফেলুন।
অন্য দেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি অধিদপ্তরের : গত ৪ জুন এক বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট, বিশেষ করে করোনার ওমিক্রন ধরনের কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংক্রমণ প্রতিরোধে ভারত ও অন্যান্য সংক্রামক দেশ এবং বাংলাদেশ হতে ভারত এবং অন্যান্য সংক্রামক দেশে ভ্রমণরত নাগরিকদের জন্য দেশের সব স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরের আইএইচআর ডেস্কগুলোতে সার্ভিল্যান্স জোরদার এবং রিস্ক কমিউনিকেশন কার্যক্রম জোরদার করতে সচেতনতামূলক ও ভ্রমণসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হয়।
দেশে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভারত ও অন্যান্য আক্রান্ত দেশগুলোতে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়।
দুটি নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত : দেশে ওমিক্রনের দুটি নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি ও এক্সএফসি শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বাংলাদেশে ওমিক্রনের দুটি নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি ও এক্সএফসির আবির্ভাব হয়েছে, যা সম্প্রতি কভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এ বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই জেএন.১ গ্রুপের ভ্যারিয়েন্ট এখন বেশ কয়েকটি অঞ্চলে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এটি এখনো আশঙ্কার বড় কারণ নয়।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, এ বছরের মে মাসে কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুরে অবস্থিত আইসিডিডিআর,বির হাসপাতালভিত্তিক ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিল্যান্স স্টাডি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এ ভ্যারিয়েন্ট ৭ শতাংশ ছিল।
আতঙ্কিত হওয়ার কারণ না থাকলেও আইসিডিডিআর,বি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানানো হয়।
মেট্রোরেল যাত্রীদের মাস্ক পরার অনুরোধ : বাংলাদেশ রেলওয়ের পর এবার মেট্রো রেল কর্র্তৃপক্ষ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহার করার অনুরোধ করেছে। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড গত সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ জানায়। এর আগে ঈদুল আজহার ছুটির পর রাজধানীমুখী যাত্রীদের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ও মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার আহ্বান জানিয়েছিল।
বাড়তি সতর্কতা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্র্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. ইব্রাহিম খলিল জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে আসা যাত্রীদের জন্য ইমিগ্রেশন এলাকায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার আলাদা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপতে বসানো হয়েছে থার্মাল স্ক্যানার। এ ছাড়া বিমানবন্দরের যাত্রী ও কর্মীদের জন্য মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দিনাজপুরের হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মাস্ক পরার পরেই পাসপোর্ট যাত্রীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও কাস্টমসে। তবে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে এখনো কার্যক্রম শুরু করেনি মেডিকেল টিম।
চট্টগ্রামে নারীসহ ৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত : চট্টগ্রামে তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রামে এটিই প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের ঘটনা। নতুন করে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনজনের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। তবে তারা করোনার কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত, তা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি সিভিল সার্জন কর্তৃপক্ষ।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত সোমবার চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে ২৩ জনের করোনা পরীক্ষা করে দুজনের শরীরে এর জীবাণু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন পুরুষ ও একজন নারী। তাদের একজনের বয়স ৭৫ ও অন্যজনের ৫৫ বছর। গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৪৪ জনের পরীক্ষা শেষে ৩০ বছর বয়সী এক নারীর শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত তিনজনই শহরের বাসিন্দা।
সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে সোমবার দুজনের করোনা শনাক্ত হয়। গতকাল এক নারীর করোনা শনাক্ত হয়েছে। তিনজনই ভালো আছেন। আক্রান্তরা আমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। দুজন বাড়ি ফিরে গেছেন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর নতুন ধরন ছড়াচ্ছে। ভারতের এনবি ১.৮.১ নামের নতুন ধরনটিও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ২৩ মে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এনবি ১.৮.১ ধরনটির সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি এবং এটি দ্রুত ছড়াচ্ছে।