তিন দিনে ঢাকায় ৫২ হাজার টন কোরবানির বর্জ্য অপসারণ

কোরবানি ঈদের পর গত সোমবার পর্যন্ত তিন দিনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৫২ হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আরও দুদিন এ কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

শনিবার ঈদের দিন সকালে নামাজের পরপরই রাজধানীর অলিগলিতে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। দুপুরের আগেই রাস্তায় জমা পশুবর্জ্য অপসারণে মাঠে নামেন দুই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।

এদিন দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কাজের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। এ সময় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্ধারিত যে সময় বেঁধে দিয়েছে, আশা করছি এর মধ্যেই তারা বর্জ্য অপসারণের কাজ শেষ করতে পারবে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নগরবাসীকে একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দিতে পারব।’

ঈদের দ্বিতীয় দিন রবিবার ও তৃতীয় দিন সোমবারও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশু জবাই করা হয়েছে। জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে এবার পশু কোরবানি হয়েছে ৬ লাখ ৩২ হাজার ৮৩৪টি। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮০টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫৪টি পশু কোরবানি হয়েছে।

দক্ষিণে বর্জ্য অপসারণ সমাপ্তি ঘোষণা : ঈদের তৃতীয় দিন সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য অপসারণ সমাপ্তি ঘোষণা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার বিকেলে রাজধানীর ওয়াসা ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসির এবারের কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া। এ সময় তিনি বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম ও দ্বিতীয় দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ড থেকে শতভাগ কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। তৃতীয় দিন পর্যন্ত ৩১ হাজার ২২৬ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এ বছর বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার অধিক বর্জ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। শাহজাহান মিয়া আরও বলেন, ডিএসসিসির অস্থায়ী ইজরাকৃত আটটি পশুর হাটের মধ্যে আটটি হাটের বাঁশের খুঁটি, ভাসমান ও উড়ন্ত ময়লা অপসারণ করা হয়েছে। হাটের সামগ্রিক বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম প্রায় শেষপর্যায়ে। আশা করা যায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হবে।

উত্তরে চলমান বর্জ্য অপসারণ : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে ঈদুল আজহার তিন দিনে ২০ হাজার ৮৮৯ টন কোরবানির পশু বর্জ্য অপসারণের পর, আরও দুদিন এ কাজ চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ডিএনসিসি। সোমবার ডিএনসিসি নগর ভবনে আয়োজিত কোরবানির বর্জ্য অপসারণবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, সোমবার ঈদুল আজহার তৃতীয় দিনে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও তা মঙ্গল ও বুধবার চলমান থাকবে। ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ‘প্রথম দিনের আগে আমরা এস্টিমেট (ধারণা) করেছিলাম এবার প্রায় ২০ হাজার টন ময়লা উৎপাদন করা হবে। সোমবার পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে, যেটা আমরা কালেক্ট করতে পেরেছি এবং ল্যান্ডফিলে ডাম্প করতে পেরেছি।’

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বর্জ্য অপসারণের হালনাগাদ তথ্য জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবিএম সামসুল আলম বলেন, ‘ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বর্জ্য অপসারণের পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, আজকে (গতকাল) নতুন করে পরিসংখ্যান দিতে চাই না।’

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে ইশরাক : ঈদের দিন শনিবার ডিএসসিসি রাজধানীর ধোলাইখাল এলাকায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিদর্শনে যান বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। সেখান থেকে রহমতগঞ্জ পোস্তা হয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করেন। পরে ডিএসসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিউ বেইলি রোড যান। এ ছাড়া হাজারীবাগ, শাহজাহানপুর, ব্রাদার্স ক্লাব ও কমলাপুরের পশুর হাট ঘুরে দেখেন ইশরাক। এর আগে তিনি নগর ভবনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকিসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে যান। এসব জায়গায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন ইশরাক হোসেন। পাশাপাশি কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসরাণে নগরবাসীর সহায়তা চান।

এক বছরের ব্যবধানে কোরবানি কমেছে সাড়ে ১২ লাখ : দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা কারণেই প্রভাব পড়েছে এবারের কোরবানিতে। এতে করে কমেছে পশু কোরবানির সংখ্যা। গত বছরের তুলনায় এবার সাড়ে ১২ লাখের বেশি পশু কোরবানি কম হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মূলত পশু কোরবানির হিসাব করে থাকে। অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলার কর্মকর্তাদের তথ্যের ভিত্তিতে হিসাবটি করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি গতকাল মঙ্গলবার কোরবানির পশুর সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে এ বছর বাংলাদেশে ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছে সারা দেশে। এর মধ্যে গরু ও ছাগলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেখানে গত বছর মোট কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ পশু।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছে। যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি, ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য পশু ৯৬০টি। এ বছর ৪৭ লাখ ৫ হাজার গরু-মহিষ কোরবানি হলেও গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৭৯টি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির পশু অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি। কারণ হিসেবে অধিদপ্তর বলছে, এবার কোরবানির পশুর উৎপাদন বেশি ছিল। তাই পশু অবিক্রীত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তা ছাড়া অবিক্রীত এই পশু সামনে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে দরকার পড়বে।

এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখের বেশি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবার সবচেয়ে কম পশু কোরবানি হয়েছে সিলেট বিভাগে। এই সংখ্যা ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮২৩টি। এরপর কম পশু কোরবানি হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এই সংখ্যা ৩ লাখ ৮৩ গাজার ১৬২টি। আর সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এই সংখ্যা ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টি গবাদি পশু। এর পর বেশি কোরবানি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই সংখ্যা ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি। চট্টগ্রাম বিভাগে কোরবানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩২টি গবাদিপশু। খুলনা বিভাগে কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪ হাজার ২২৪টি গবাদিপশু। বরিশাল বিভাগে কোরবানি হয়েছে ৪ লাখ ৭৮৩টি এবং রংপুর বিভাগে কোরবানি হয়েছে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯টি গবাদিপশু।