ঈদের পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এর মধ্যে কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজও শেষ হয়েছে। এখন মৌসুমি ব্যবসায়ী, আড়তদার ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ডাকের অপেক্ষায় আছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছে, সরকারের আন্তরিকতায় অন্য বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে। পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহের ফলে চামড়ার গুণমান ঠিক থাকবে বলে ট্যানারি মালিকরা আশা করছেন। ফলে সরকার নির্ধারিত বা তার থেকে বেশি দামে চামড়া বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ বছরের মধ্যে লবণযুক্ত চামড়ার দাম সবচেয়ে বেশি এ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর লবণযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, এ বছর চামড়া সংগ্রহে তাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ পিস। গত বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ পিস। সারা বছর যে পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়, তার ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কোরবানির ঈদে সংগ্রহ হয়ে থাকে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু, যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি। ছাগল ও ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ এবং অন্যান্য ৯৬০টি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানিয়েছে, সারা দেশে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কমপক্ষে ৬০ লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হিসাব এখন তারা তৈরি করতে পারেনি। এ সপ্তাহে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঈদকেন্দ্রিক চামড়ার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান এনডিসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং যথাসময়ে লবণ সরবরাহসংক্রান্ত উদ্ভূত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে এবারের ব্যবস্থাপনা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় ভালো ছিল। মন্ত্রণালয় মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোকে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করেছে। এর সুফল ইতিমধ্যে আমরা পাচ্ছি। গত বছর এতিমখানা বা লিল্লা বোর্ডিংয়ে মাত্র দুই লাখের কিছু বেশি কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ করেছিল। এ বছর ফ্রিতে লবণ সরবরাহ করায় সে সংখ্যা ১৯ লাখ অতিক্রম করেছে। আশা করা যাচ্ছে, এ পদ্ধতিতে তারা চামড়ার সঠিক ও লাভজনক মূল্য পাবেন। এ ছাড়া প্রতি বছরের মতো এ বছরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। কন্ট্রোল রুম থেকে আমরা যথাযথভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি। এক কথায় এ বছর অনেক সুশৃঙ্খলভাবে কোরবানির কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এখন চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়টি বিসিক তদারকি করছে।
যোগাযোগ করা হলে বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, কোরবানির পশুর চামড়া তিনটি পর্যায়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়। এর প্রথম ধাপ হলো এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা, দ্বিতীয়টি হলো জেলা, উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং তৃতীয়টি হলো ট্যানারি কারখানায় সংরক্ষণ। প্রথম দুটি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে শেষ হয়েছে, এখন ট্যানারিকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে যে তথ্য এসেছে, সেখানে ৬০ লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে আগামী সপ্তাহের (চলতি) মধ্যে আমরা পরিপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারব। এখন তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের লোকসানের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর আমাদের কাছে এসেছে। এটি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের থেকে বেশি এসেছে। মূলত গরমের কারণে ব্যবসায়ীরা চামড়ায় যথাসময়ে লবণ না দেওয়ার কারণে মান নষ্ট হয়েছে এবং তারা সঠিক মূল্য পায়নি। এ ছাড়া মসজিদ, মাদ্রাসা বা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের লবণযুক্ত চামড়া সঠিক এবং সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।
এ সাফল্যের পেছনে সরকারের বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের উদ্যোগ ব্যাপকভাবে কাজ করেছে দাবি করে তিনি বলেন, এ বছর সরকার বিনামূল্যে লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোকে লবণ সরবরাহ করেছে। এ ছাড়া বাজার পরিস্থিতি বুঝে পর্যাপ্ত লবণ বাজারে দেওয়া হয়েছে, যাতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সে ক্ষেত্রে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লবণ সংগ্রহ না করে কাঁচা চামড়া বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। ফলে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যারা সঠিকভাবে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করেছে, তাদের লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনছেন। চাহিদা ও মানের ভিত্তিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দামে কিনছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বছর ৮০ লাখ পিস পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা কার্যক্রম শুরু করেছি। ইতিমধ্যে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ছয় লাখের মতো চামড়া ট্যানারি ও পোস্তায় এসেছে। সরকারের নির্দেশনায় শনি-রবিবার থেকে ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া আসতে শুরু করবে।
তিনি বলেন, লবণের বাজার অত্যন্ত সুন্দর ও স্থিতিশীল ছিল। কারসাজি বা অপতৎপরতা আমাদের চোখে পড়েনি। এর অন্যতম কারণ হলো সরকার বিনামূল্যে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় লবণ সরবরাহ করেছে। এতে চামড়ার গুণমান ভালো থাকার সম্ভাবনা বেশি। যারা সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করেছেন, তারা নির্ধারিত বা তার চেয়ে বেশি দামেও বিক্রি করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে। তবে মৌসুমি যেসব ব্যবসায়ী চামড়ায় লবণের ব্যবহার সময়মতো করতে পারেনি, তারা লোকসানে পড়েছে। এর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। কারণ, সরকার খোলাবাজারে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ করেছে। কোথাও লবণের জন্য হাহাকার হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য নেই।
এবারের কোরবানি ঈদ উপলক্ষে দেশের প্রায় সব এতিমখানা ও মাদ্রাসা বা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করেছে।
বিসিক চামড়া শিল্পনগরী সাভার সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে ১৪২টির প্রস্তুতি ভালো এবং কার্যক্রম চলমান। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া শিল্পনগরীর অন্যান্য পরিবেশ ঠিক রাখতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। সবসময় তদারকির ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।