ডা. মারিয়া কিবতিয়ার
শিশু বিশেষজ্ঞ, বিভাগীয় প্রধান, নবজাতক ও শিশু বিভাগ, ডিভাইন মারসি হাসপাতাল
থ্যালাসেমিয়া রক্তের আরেকটি জটিল রোগ। এটি একটি জেনেটিক রোগ। এই রোগে রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিমগ্লোবিন খুব দ্রুত ভেঙে যায়। তাতে করে শিশুর শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা যায় এবং শিশুকে বারবার রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। চলুন, আজ আমরা জেনে নেই থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান লক্ষণ কী কী, এই রোগের চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে :
লক্ষণ
জন্মের পর প্রথম ১ বছর পর্যন্ত শিশুর মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ১ বছর পর থ্যালাসেমিক শিশুরা প্রথমত শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া নিয়ে প্রকাশ করে। এসব শিশুর যেমন শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় ঠিক তেমনি ঘন ঘন ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। সঙ্গে রক্তস্বল্পতা এবং জন্ডিসের সমস্যা থাকতে পারে। পেট ফুলে যায়।
শিশু দেখতে অন্য শিশুদের থেকে একটু আলাদা হয়। তার কপাল সামনের দিকে বেরিয়ে আসে, চোয়ালের হাড় বেড়ে যায়, ওপরের পাটির দাঁত বেরিয়ে আসে। শিশুর মৃদু উপসর্গ থাকলে এটিকে বলা হয় থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট। এসব শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিজনিত কোনো সমস্যা অথবা অন্যান্য জটিল কোনো সমস্যা নাও থাকতে পারে। অল্পমাত্রায় রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে, যা পরবর্তী সময় শরীরে কোনো ইনফেকশন হলে বেড়ে যায়। সাধারণত বাবা-মায়ের আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে শিশুর থ্যালাসেমিয়া হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে বেড়ে যায়।
চিকিৎসা
যেসব শিশু তীব্র উপসর্গ নিয়ে প্রকাশ করে তাদের বারবার রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। বারবার রক্ত দেওয়ার জন্য শরীরে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন আয়রনকে ভাঙার জন্য আয়রন চিলেটর দিতে হয়।
অতিরিক্ত আয়রন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন যকৃত, প্লীহা, অগ্ন্যাশয়ে জমে গিয়ে অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। বিশেষ করে অতিরিক্ত আয়রন জমে প্লীহা বেশি বড় হয়ে গেলে অপারেশন করে প্লীহা কেটে ফেলতে হয়। স্টিম সেল, বোন মেরো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন এই রোগের স্থায়ী চিকিৎসা হিসাবে ধরা হয়।
প্রতিরোধ
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সচেতনতা তৈরি করার কোনো বকল্প নেই। দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের শিশুদের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার ২৫ ভাগ সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য বিয়ের আগে ছেলেমেয়ে উভয়ের রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে ফেলা সম্ভব।
এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক হলেও শিশু থ্যালাসেমিক কিনা তা গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষ-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পরিবারের একজন যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে বাকিদেরও রক্ত পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বাহক নির্ণয় করার মাধ্যমে এই রোগের প্রতিরোধ করা সম্ভব।