ভারতের গুজরাট রাজ্যের বৃহত্তম শহর আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭৮-এ পৌঁছেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মরদেহ শনাক্তকরণ ও হস্তান্তরে বিলম্বের কারণে শোকাহত স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
গত বৃহস্পতিবার সকালে উড্ডয়নের মাত্র ৩৬ সেকেন্ড পর উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আহমেদাবাদের সরদার ভাল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মেঘানিনগর এলাকায় একটি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের ওপর বিধ্বস্ত হয়। বিস্ফোরণে উড়োজাহাজটি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, যার ফলে ২৪২ আরোহীর মধ্যে ২৪১ জন নিহত হন। গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্যের গ্যাটউইক বিমানবন্দর। রয়টার্স জানিয়েছে, এটি গত এক দশকের মধ্যে বিশে^র সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা।
নিহতদের মধ্যে ৩৩ জন মাটিতে ছিলেন, যাদের অধিকাংশই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২৭৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে, অধিকাংশ মরদেহ এতটাই দগ্ধ বা খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে, সাধারণ উপায়ে শনাক্তকরণ সম্ভব হচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষা ও দন্ত রেকর্ডের মাধ্যমে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে, তবে এতে কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। ফরেনসিক দন্তবিশেষজ্ঞ জয়শঙ্কর পিল্লাই বলেন, ‘১৩৫টি মরদেহের ডেন্টাল রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পুরনো দন্তচিকিৎসা নথির সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করা হচ্ছে।’
মরদেহ শনাক্তকরণে বিলম্বের কারণে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। আহমেদাবাদের একটি হাসপাতালে মরদেহের খোঁজে জড়ো হওয়া স্বজনরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। চারজন স্বজনকে হারানো রফিক আবদুল হাফিজ মেমন বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের হারিয়েছি। কর্র্তৃপক্ষ সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। কখন মরদেহ হস্তান্তর হবে, তা জানানো হোক।’ হর্ষদ প্যাটেলের বাবা বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষায় ৭২ ঘণ্টা লাগবে বলা হয়েছে। ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি।’
একমাত্র জীবিত যাত্রী, ৪০ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বিষ্ণু কুমার রমেশ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, “উড্ডয়নের ৩৬ সেকেন্ড পর বিকট শব্দ হয়, তারপর সব শেষ। ঘটনা চোখের পলকে ঘটে গেছে।’
তদন্তে অগ্রগতি হিসেবে শুক্রবার দ্বিতীয় ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ দল তদন্তে যোগ দিয়েছে, পাশাপাশি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা গার্ড, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফরেনসিক ইউনিট কাজ করছে। এয়ার ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, উড়োজাহাজে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, একজন কানাডীয় এবং সাতজন পর্তুগিজ নাগরিকসহ ২৩০ যাত্রী, ১০ ক্রু ও দুজন পাইলট ছিলেন।
ভারত সরকার বোয়িং ৭৮৭ মডেলের ৩৪টি উড়োজাহাজের খুঁটিনাটি পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাম মোহান নাইডু জানান, ‘জরুরি ভিত্তিতে আটটি উড়োজাহাজ পরীক্ষা করা হয়েছে। ইঞ্জিন থ্রাস্ট, ফ্ল্যাপ, ল্যান্ডিং গিয়ার ও জ¦ালানি ব্যবস্থা যাচাই করা হচ্ছে।’ এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বাড়তি পরীক্ষার কারণে দীর্ঘ দূরত্বের কিছু রুটে বিলম্ব হতে পারে।
টাটা গ্রুপ, যারা ২০২২ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার মালিকানা গ্রহণ করে জানিয়েছে, তারা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন বলেন, ‘আমরা বোঝার চেষ্টা করছি কী ঘটেছিল, তবে এখনো নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি।’ গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাংভি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।