আমে চাঙ্গা চাঁপাইনবাবগঞ্জ

যে আম দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে চেনা যায়, সেই আমের রাজধানী চাঁপাইনবাগঞ্জের ‘আম অর্থনীতি’ এখন বেশ চাঙ্গা। বছর জুড়েই ‘আম’কে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকা- চললেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাণিজ্য চলবে আগামী পুরো তিন মাস। এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এখানকার আমচাষি থেকে শুরু করে আম ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।  হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানসহ ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের পদচারণায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলছে আমের মহোৎসব। এই মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার আমের ব্যবসা হবে আশা করা হচ্ছে।

মাটি, আবহাওয়া ও প্রকৃতিগত কারণেই ভালো সুস্বাদু ও রসালো আম উৎপাদনের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের খ্যাতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই। গত এক দশকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগান বৃদ্ধি পেয়েছে রেকর্ড পরিমাণে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০০৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগানের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর। ২০০৬ সালে ১০০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে বাগানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর। আর এখন (২০২৫ সালে) আমবাগানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর। অর্থাৎ ১০ বছরে বাগানের পরিমাণ বেড়েছে ২০ হাজার ৮৫৪ হেক্টর। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোট ৮১ লাখ ৪৫ হাজার আমগাছ থেকে আম উৎপাদিত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রকৃতিগতভাবেই আমের উৎপাদনের বছর দু’ভাগে ভাগ হয়ে আসছে সুদীর্ঘকাল থেকে। এক বছর বেশি ফলন হলে পরের বছর কম ফলন হয় প্রাকৃতিকভাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারা দেখা যায় না। প্রতিবছরেই কম-বেশি ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। মৌসুম শুরুর ২/৩ মাস আগে থেকেই আরম্ভ হয় বাগান কেনাবেচা। কেউ কেউ মুকুল আসার আগেই বাগান কিনে থাকেন। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে পাতায় বাগান কেনা। পরে কেনাবেচার স্তরগুলো থাকে মুকুল আসাবস্থায়, আমের গুটি ধরা ও বড় হওয়ার সময়। সম্প্রতিক বছরগুলোয় আম ব্যবসায়ীরা বাগান কেনার ধরন পরিবর্তন করেছেন। ১ বছরের জন্য বাগান কিনে লোকসানের ঝুঁকি থাকায় তারা এখন একই বাগান একই মালিক ৩ বছর থেকে শুরু করে ৫-৬ বছর পর্যন্ত কিনে নিচ্ছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ৪টি প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় অর্ধশত আমের বাজার রয়েছে। তবে এর মধ্যে দেশের বড় আমের বাজারটি বসে কানসাট।  কানসাট আম বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ শতাধিক আমের আড়ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আমের বড় বাজারটি বসে পুরাতন বাজারে। মহানন্দা নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন এই আমের বাজার এখন রমরমা। সদর গোবরাতলা, মহিপুর, বালিয়াডাঙ্গা, বারোঘরিয়া, মাহরাজপুর, কালিনগরসহ শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আমই এ বাজারের মূল জোগানদাতা। মহানন্দা আর পুনর্ভবা নদীপথকে ঘিরে অর্ধ শতাব্দী আগে গড়ে ওঠা রহনপুর আম বাজার এখন রমরমা ভাব পেয়েছে বাজারকে ঘিরে সড়কপথ যোগ হওয়ায়। রহনপুর রেলস্টেশনের সামনে এই আমের বাজার বসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী উপজেলা ভোলাহাটেও বসছে আমের বাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুযায়ী চলতি মৌসুমে আমের বাণিজ্য হবে প্রায় ৪শ কোটি টাকা। ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি থেকে এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন। প্রতিকেজি আমের গড় দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা ধরলে আমের কৃষক মূল্যই দাঁড়ায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক খরচসহ পরিবহন, ঝুড়ির বাণিজ্য ধরে আশা করা হচ্ছে এবার ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি ‘আম বাণিজ্য’ হবে। তবে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমকে ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাণিজ্য যুক্ত করা গেলে টাকার অঙ্ক বাড়বে কয়েকগুণ। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। আম একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য। আমকে আমরা শিল্পপণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আমরা আম প্রক্রিয়াকরণ করছি না। প্রক্রিয়াকরণ করা হলে এখন যে বাজারমূল্য বলা হচ্ছে তা ৩ গুণ বেড়ে যাবে। কর্মসংস্থান হবে, কৃষিপণ্যের অন্য ব্যবহারগুলো বাড়বে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি বড় হবে এবং জিডিপিতে অবদান রাখতে পারব।’ চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী বলেন, ‘আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রচলিত জাতের আম বেশি উৎপাদন হতো। এখন বাণিজ্যিক জাতের আমও উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি উত্তম কৃষিচর্চার মাধ্যমে কৃষকদের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করার কারণে ইদানীং রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর প্রায় ৩৬টি দেশে আম রপ্তানি হয়েছে। এবার চীন যুক্ত হয়েছে। এবার আমাদের ৬ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানি হবে। আশা করা যায়, ৬০ কোটি টাকারও বেশি আয় হবে রপ্তানি থেকে।’