ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-ইসরায়েলের সংঘাত ঘিরে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্য। গতকাল রবিরার দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। এতে উভয় দেশেই সামরিক-বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। 

ইরানের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর তেহরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। দুই দেশই সামরিক ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলের হামলায় শাহরান ডিপো ও ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ইরানের পাল্টা হামলায় তেল আবিবের বেশ কিছু স্থান ও ইয়াম শহর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

রবিবার মধ্য ও উত্তর ইসরায়েল এবং জেরুজালেম অঞ্চলে ইরানের হামলায় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। এদিন ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পরিদর্শন করতে গিয়ে, ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ার দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিপরীতে আবার হামলা করলে আরও কড়া জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে দুপক্ষই সংঘাত বন্ধে অবিলম্বে চুক্তি করবে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চলমান এ সংঘাতের মধ্যে রবিবার ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। এর জেরে মধ্য ও উত্তর ইসরায়েল এবং জেরুজালেম অঞ্চলে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেসব এলাকায় সাইরেন বাজছে, সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। 

সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, সর্বসাধারণের চলাচল সীমিত করুন, যেকোনো ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। সতর্কবার্তা পেলে দ্রুত সুরক্ষিত স্থানে আশ্রয় নিন এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগপর্যন্ত সেখানে অবস্থান করুন। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একযোগে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে আবারও বিস্ফোরণ ঘটেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের শিরাজ ও কেন্দ্রীয় প্রদেশ ইস্পাহানে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যম। এর মধ্যে ইস্পাহানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএসএনএ। আলজাজিরা জানিয়েছে, হামলাগুলো তেহরানের উত্তরে নিয়াভারান এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে ভালিয়াসর ও হাফতে তির স্কয়ারের আশপাশে ঘটেছে বলে জানা গেছে। তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শাহরাক-ই-গারব এবং সাদাত আবাদ এলাকায় বিকট আকারে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিচাই আদ্রাই দাবি করেছেন, ইস্পাহানে ইসরায়েল যে হামলা চালিয়েছে, তা একটি পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করেই করা হয়েছে। যদিও ইরান এ দাবির ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

জ্বালানি ডিপোতে পাল্টাপাল্টি হামলা: ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত তীব্র রূপ ধারণ করছে। উভয়পক্ষই কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার রাতে ইসরায়েলি হামলায় রাজধানীর শাহরান তেল ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলে একটি তেলের ডিপোর কাছে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান। ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ তাদের জ্বালানি ডিপোতে ইরানি হামলার ব্যাপারে মুখ না খুললেও বিবিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলের তেলের ডিপোতে হামলার একটি যাচাই করা ভিডিও তাদের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরায়েলের হাইফা তেল শোধনাগারের কাছে আগুন জ্বলছে।

তেহরানে অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা: তেহরানের কমপক্ষে ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। যেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলো মধ্যে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর, সামরিক বাহিনীর গবেষণা ও উন্নয়ন ইউনিট ছাড়াও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ)। ইসরায়েলের একজন সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের একটি জ্বালানি কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে, যেটি সামরিক ও পারমাণবিকÑ উভয় কাজে ব্যবহার হতো। আইডিএফের দাবি অনুযায়ী, ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ শুরু হওয়ার পর গত তিন দিনে তারা ইরানের ১৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তু এবং ৭২০টি সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।

মোসাদের দুই গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার: ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে ইরান। তাদের আলবোর্জ প্রদেশের সাভোজবোলাঘ কাউন্টি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে এক খবরে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। খবরে আরও বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন ওই দুই ব্যক্তি আলবোর্জের একটি সেফ হাউজে থেকে মোসাদের পক্ষে কাজ করত। তারা বিস্ফোরক তৈরি করত বলে দাবি করেছেন ইরানের পুলিশ কর্মকর্তারা।

জরুরি বৈঠকের ডাক আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার জেরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমে বাড়তে থাকার মধ্যেই জরুরি বৈঠকের ডাক দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। আজ সোমবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত সংস্থাটির সদর দপ্তরে ওই বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। সংস্থাটির কাছে এ বৈঠকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা।

ইরানের বাসিন্দাদের ইসরায়েলের সতর্কতা: ইরানের রাজধানী তেহরানের অস্ত্র কারখানাগুলোর আশপাশে বসবাসকারী ইরানিদের সরে যেতে বলেছে ইসরায়েল। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া দুই দেশের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে ইসরায়েল ইরানিদের এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্ৎজ বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী এ কারখানাগুলোতে হামলা চালাবে এবং তেহরানের সক্ষমতা ধ্বংস করবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওইসব এলাকায় তাদের ফিরে না আসারও আহ্বান জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চাইল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী: ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চেয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইংরেজিতে দেওয়া এক এক ভিডিও বার্তায় এ সমর্থন চান তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীনতা রক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাদের জনগণ এবং বিশ্বের আরও অনেকের স্পষ্ট সমর্থনে ইসরায়েল এটি করছে।

নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি: ইরানের হামলায় ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাত ইয়ামের আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখার সময় তিনি এ কথা বলেন। ইরানের হামলাকে নেতানিয়াহু ‘বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিশুদের’ পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা বলেও অভিহিত করেছেন। ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ট্রাম্পের আশা: ইরান-ইসরায়েলের এ সংঘাত সহজেই শেষ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তবে তিনি তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যেন কোনো যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না হানে, অন্যথায় করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। রবিবার নিজের সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লেখেন ইরান ও ইসরায়েলের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত; দুই দেশই চুক্তিতে পৌঁছাবে। তিনি আরও বলেন, সার্বিয়া-কসোভো এবং মিসর-ইথিওপিয়ার মতো ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যেও আমরা শিগগির শান্তি প্রতিষ্ঠা করব।

ইরানের নেতাদের প্রতিক্রিয়া: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান আলোচনার টেবিলে বসবে না। রবিবারের নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক আলোচনা বাতিল ঘোষণার পর এ কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি ইসরায়েল ইরানে আবার হামলা করলে আরও কড়া জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। তেহরানে সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরায়েল যদি ইরানে হামলা বন্ধ করে, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে।