ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও শান্তির প্রস্তাব

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৫, ১২:২৪ এএম

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাঁজায় প্রায় পৌনে দুই বছর অগণিত মানুষ হত্যার পর, ইসরায়েল এখন আক্রমণ চালাচ্ছে ইরানে। মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষ ইসরায়েলের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিলেও, দেশটির যুদ্ধক্ষুধা বেড়েই চলছে। অবশ্য সাধারণ মানুষ বিরোধিতা করলেও মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোর বেশিরভাগ শাসক ইসরায়েলের বিপক্ষে নিষ্ক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। আর দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই ইসরায়েলের পক্ষে সক্রিয় অবস্থানে। তবে, ইরানও ইসরায়েলি হামলার কঠিন জবাব দিচ্ছে। দেশটির আধুনিকতম প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে মিসাইল হামলা চালিয়েছে তারা। আর এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। রবিবার ভোররাতে ইসরায়েল ও ইরান একে অপরের ওপর নতুন করে হামলা চালায়। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই সংঘাত সহজেই শেষ করা সম্ভব।  একইসঙ্গে তিনি তেহরানকে সতর্ক করে দেন এই বলে, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা না চালায়।

কর্র্তৃপক্ষ জানায়, এই হামলায় কমপক্ষে সাতজন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। অবশ্য, ইসরায়েলি মিডিয়া এসব প্রচারে কড়া নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকে, ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তেহরান পারমাণবিক আলোচনা বাতিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ বন্ধের একমাত্র পথ ছিল এটাই। অপরদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান যে পরিমাণ হামলা এখন পর্যন্ত দেখেছে, আগামী দিনগুলোতে তার তুলনায় অনেক বেশি কিছু দেখবে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ বলেন, ‘যদি আমাদের ওপর ইরান কোনোভাবে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ শক্তি এমনভাবে ব্যবহৃত হবে, যা এর আগে কেউ দেখেনি। তবে, আমরা খুব সহজেই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি চুক্তি করতে পারি এবং এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারি।’ তিনি চুক্তির বিস্তারিত তথ্য দেননি।  ইরান জানিয়েছে, শুক্রবার ইসরায়েলের প্রথম দিনের অভিযানে সেখানে ৭৮ জন নিহত হয় এবং দ্বিতীয় দিনে আরও অনেকে। এর মধ্যে তেহরানে একটি ১৪-তলা অ্যাপার্টমেন্টে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ৬০ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে ২৯ জন শিশু ছিল। ইরান দাবি করেছে, ইসরায়েল তেহরানের শাহরান তেল ডিপোতে হামলা চালিয়েছে, তবে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। রাজধানীর কাছে একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগে এবং ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনেও হামলা চালায় ইসরায়েল, তবে সেখানে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে। ইসরায়েলে শনিবার রাত ১১টার একটু পর (গ্রিনিচ মান সময় ২০০০) ইরানের নতুন হামলার ঢেউ শুরু হয়। জেরুজালেম ও হাইফায় বেজে ওঠে বিমান হামলার সাইরেন, প্রায় ১০ লাখ মানুষ বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়।

রবিবার রাত আড়াইটার দিকে (স্থানীয় সময়), ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের সতর্কতা দেয় এবং সবাইকে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানায়। তেল আবিব ও জেরুজালেমের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে কার্যকরীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তারা। প্রায় এক ঘণ্টা পরে আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে, ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের জাফা শহরে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা ইরানের কোনো মিত্রের এই প্রথম সরাসরি যুক্ত হওয়া। ইসরায়েলি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, রাতভর হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী এক ছেলে, একজন ছোট মেয়ে এবং ২০-এর কোটার এক নারী রয়েছে। আহত হয়েছে ১৪০ জনের বেশি। ইসরায়েলি গণমাধ্যম বলছে, তেল আবিবের দক্ষিণের শহর বাত ইয়াম-এ এক হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিখোঁজ রয়েছে। জরুরি সেবার একজন মুখপাত্র জানান, একটি ৮ তলা ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, অনেককে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও মৃত্যু হয়েছে কয়েকজনের। রাতভর ঠিক কতগুলো ভবন হামলার শিকার হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ইরানের পাল্টা হামলা শুরুর পর থেকে ইসরায়েলে অন্তত ১০ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছে।

রবিবার ওমানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পরমাণু আলোচনা, কিন্তু সেটি বাতিল হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, ‘ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলার’ মধ্যেই আলোচনা সম্ভব নয়। তাসনিম জানায়, শনিবার ইসরায়েলের হামলায় বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র দক্ষিণ পার্স-এ আগুন লাগে, ফলে আংশিকভাবে উৎপাদন স্থগিত করা হয়। ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত এই গ্যাসক্ষেত্রটি দেশের প্রধান গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৯ শতাংশ বেড়েছে, যদিও ইসরায়েল প্রথম দিনে ইরানের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো অক্ষত রেখেছিল। ইরানের এক জেনারেল, এসমাইল কোসারি বলেন, তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করছে, যেটি উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল বলছে, তাদের অভিযান কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে এবং নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে তাদের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন। এতে করে এই সংঘাতে বাইরের শক্তিগুলোর জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। তেহরান সতর্ক করেছে, ইসরায়েলের মিত্ররা যদি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে সহায়তা করে, তবে তাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

গাজায় ২০ মাসের যুদ্ধ এবং গত বছরের লেবাননের সংঘাত ইরানের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হামাস ও হিজবুল্লাহকে দুর্বল করে দিয়েছে, ফলে ইরানের প্রতিশোধ নেওয়ার বিকল্পগুলো সীমিত হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল মনে করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ইসরায়েল বলেছে, এই বোমাবর্ষণ পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ ঠেকানোর জন্য। অন্যদিকে, তেহরান বলছে তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক এবং তারা পরমাণু বোমা তৈরি করতে চায় না। তবে, জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সম্প্রতি জানিয়েছে, ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির কিছু শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা চলতি সপ্তাহেই পরিষ্কার হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত