জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সই করলেও বাংলাদেশ এখনো বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত বহু চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর বক্তব্য শোনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো এই দুটি দিককে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের (ডব্লিউজিইআইডি) প্রতিনিধিরা।
ঢাকা সফররত ডব্লিউজিইআইডি ডব্লিউজিইআইডির ভাইস চেয়ারপারসন গ্রাজিনা বারানোস্কা ও সদস্য আনা লোরেনা ডেলগাদিলো পেরেজ গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রুহুল আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে ডব্লিউজিইআইডির ভাইস চেয়ারপারসন গ্রাজিনা বারানোস্কা বলেন, ‘বাংলাদেশ সফর আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সনদে সই করার পর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো বাস্তবতার মূল্যায়ন ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের সহায়ক ভূমিকা পালন করা।’ তিনি বলেন, এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে এবং সুষ্ঠু তদন্তই এগুলো মোকাবিলার পথ।
ওয়ার্কিং গ্রুপের অন্য সদস্য আনা লোরেনা ডেলগাদিলো পেরেজ বলেন, ‘আমরা গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে চাই, তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে চাই।’
গুমের ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গত দেড় দশকে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্তে জাতিসংঘের যেকোনো ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করবে। গতকাল ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ডব্লিউজিআইডির ভাইস চেয়ারপারসন গ্রাজিনা বারানোস্কা এবং সদস্য আনা লোরেনা ডেলগাদিয়ো পেরেজ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, জাতিসংঘ আমাদের চলমান তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হোক। এতে প্রক্রিয়াটি আরও শক্তিশালী হবে।’
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা গুমের ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গৃহীত উদ্যোগ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে (আইসিপিপিইডি) বাংলাদেশের সংযুক্তির প্রশংসা করেন। তবে এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক কিছু করার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। তারা গুমের ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের কাজ এবং প্রতিশ্রুতিকেও সাধুবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকার ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনের মেয়াদ বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “তাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হলেও কমিশন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। তারা যখন সর্বশেষ প্রতিবেদন জমা দিল, আমি বলেছিলাম, দর্শনার্থীদের জন্য একটি ‘ভয়ের জাদুঘর’ থাকা উচিত। আপনাদের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। আমাদের সহায়তা ও একসঙ্গে কাজ করার দরকার।”
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, ১৩ বছর পর আমরা জাতিসংঘের একটি দলকে এখানে স্বাগত জানাতে পারছি। আমরা চাই আপনারা আমাদের কমিশনের কাজকে সহায়তা করুন এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত থেকে দিকনির্দেশনা ও শক্তি জোগান।’
বারানোস্কা জানান, ২০১৩ সাল থেকে তারা বাংলাদেশে গুম ইস্যুতে কাজ করার চেষ্টা করছেন এবং তদন্ত কমিশন গঠনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিশন ও এর কাজ আপনার সরকারের এক বিশাল প্রতিশ্রুতি। এজন্য আপনাদের ধন্যবাদ। এটি আমাদের জন্য এক বিশাল সম্মান।’
তিনি আরও জানান, তারা ঢাকার বাইরে গিয়ে ভুক্তভোগী, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
এর আগে ডব্লিউজিইআইডি দুই প্রতিনিধি গতকাল সচিবালয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর আইন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, গুমবিরোধী আইন প্রণয়ন ও একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আইনটির খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং আগামী এক মাসের মধ্যেই ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনসহ আইনটি অধ্যাদেশ আকারে কার্যকর হতে পারে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, গুম বিষয়ে সরকার আইনপ্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ডব্লিউজিইআইডি। তারা ইতিমধ্যে সরকার গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো যায় কি না, সেটি বলেছে। জবাবে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকে সবাই বসে নেবে। তিনি বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উত্থাপন করবেন। তবে তিনি ডব্লিউজিইআইডির প্রতিনিধিদের এ কথাও বলেছেন, সরকার গুম বিষয়ে যে আইন করবে, সেই আইনের অধীন খুব শক্তিশালী কমিশন গঠনের ইচ্ছা আছে।
সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, আইন করার প্রক্রিয়াটি কোন অবস্থায় আছে বা কতদিন লাগতে পারে। জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, তারা আশা করছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে গুমবিষয়ক আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন অধ্যাদেশ হয়ে যাবে।
‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন) কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও আইন উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান। জবাব তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ব্যাপারটি জেনে এসেছেন। এখন দ্বিতীয় ধাপে যে চিন্তাটি আছে, সেটি হলো, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক পরামর্শ (কনসালটেশন) করা হবে। সেখানে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিদের আনা হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ, মানবাধিকারকর্মী, ছাত্র সবার মতামত নিয়ে কী করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা করা হবে। তিনি বলেন, সরকার গঠিত গুম কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠনের ভাবনাও রয়েছে। এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা যাচাই শেষে এখন দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরামর্শ সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজ প্রতিনিধিরা মতামত দেবেন।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ডব্লিউজিইআইডি প্রতিনিধিদল বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে বলপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিপিপিইডি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে স্বাগত জানান। তারা বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন (সিওআই) কর্র্তৃক প্রদর্শিত কাজ এবং প্রতিশ্রুতিরও প্রশংসা করেন।
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মানবাধিকার সমুন্নত, সুরক্ষা ও প্রচার এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের অটল সংকল্পের ওপর জোর দেন। তিনি এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের সমর্থন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাকে স্বাগত জানান।
জামায়াতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের বৈঠক : একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ‘নো পিস উইদাউট জাস্টিস’-এর সেক্রেটারি জেনারেল নিকোলো ফিগা তালামাঙ্কা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক পরিচালক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ আব্বাস ফয়েজ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহি বিশেষজ্ঞ পাসকাল টারলান।
বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ, ও ইউরোপের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা।
প্রতিনিধিরা জামায়াতে ইসলামীর গঠন কাঠামো, সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দলের ভূমিকা সম্পর্কে অবহিত হন এবং দলটির ভবিষ্যৎ ভূমিকার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। পরে তারা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
রবিবার জাতিসংঘের গুম কমিটির দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল চার দিনের সফরে ঢাকায় আসে। ১৮ জুন তাদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
এক যুগ ধরে গুম নিয়ে তদন্ত করতে বাংলাদেশে সফর করতে চাইছিল ডব্লিউজিইআইডি। তারা প্রথম ২০১৩ সালের ১২ মার্চ সফরের জন্য সরকারকে চিঠি দেয়। এরপর একাধিকবার বাংলাদেশ সফরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও তখনকার সরকার তাতে কোনো সাড়া দেয়নি। ডব্লিউজিইআইডি বাংলাদেশ সফরে বিগত সরকারের কাছে সর্বশেষ অনুরোধ করেছিল ২০২০ সালের ২৪ এপ্রিল। তবে এবার অন্তর্বর্তী সরকার তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছে।