প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযুক্ত টিউলিপ

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোনের মেয়ে ও যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযুক্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট জালিয়াতিসহ তিনটি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। মৎস্য খামার, ইনকাম ট্যাক্সে হঠাৎ করেই ১০ থেকে ৩০ ভরি স্বর্ণ বাড়াসহ নানা অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম ও তার স্বামী তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার দুদক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মোমেন এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোমেন বলেন, টিউলিপ সিদ্দিক যতই বলুক তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। আমাদের কাগজপত্রে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। আমরা আমাদের নাগরিকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। টিউলিপ যদি নির্দোষ হন, তাহলে তার মন্ত্রিত্ব গেল কেন? তিনি কেন সরে গেলেন এবং তার আইনজীবী আমাদের কাছে কেন চিঠি লিখলেন?

এদিকে, দুর্নীতির অভিযোগে এর আগে টিউলিপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুদক। গত ১৫ জুন দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে তার ঢাকার মোহাম্মদপুরের জনতা হাউজিং সোসাইটি, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, গুলশান-১ ও ২ এলাকার আবাসিকসহ পাঁচটি ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হয়। একইসঙ্গে গুলশান থানা ও ধানম-ি থানার মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়।

দুদকের তথ্যমতে, গত ১৪ মে টিউলিপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে চিঠি পাঠান দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। ওইদিন পৃথক নোটিসে একই মামলার অপর দুই আসামি রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ খসরুজ্জামান ও সরদার মোশাররফ হোসেনকে তলব করা হয়। কিন্তু দুদকের তলবি নোটিসের পর তারা দুদকে হাজির হননি।

দুদকের তথ্যমতে, গত বছরের গত ১৭ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে দুদক। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ অগ্রাধিকারের আটটি প্রকল্পে আরও ২১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে সংস্থাটিতে। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিকসহ তাদের পরিবারের ৬ জনের বিরুদ্ধে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠার প্লট নেওয়ার অভিযোগ পায় দুদক। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানকালে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে কয়েকটি অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা দুদকের নজরে আসে। দুদক ইতিমধ্যে রাজউকের প্লট গ্রহণ ও সরকারি জমিতে আবাসন কোম্পানিকে ভবন নির্মাণের সুযোগ দিয়ে ফ্ল্যাট ঘুষ নেওয়ার ঘটনায় মামলা করেছে।

সাবেক হাইকমিশনার মুনা ও তার স্বামী ২ হাজার টাকা পাচার করেন : দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম ও তার স্বামী জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন লিমেটেডের চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পরস্পর যোগসাজশে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনসহ ১২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও নামসর্বস্ব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে আনুমানিক ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেন।

যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ৩৪৩ বাড়ি-ব্যাংক হিসাব জব্দ : দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি বাড়ি, ব্যাংক হিসাবে থাকা ৩৫ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা।  এ ছাড়া ব্যাংক হিসাবে থাকা ৩৫ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পায় দুদক।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, পাচার করা টাকায় সম্পদ গড়েছেন জাভেদের ভাই রনি এবং দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গ্রুপের চেয়ারম্যানের দুই সন্তান। তাদের সম্পদ জব্দ করতে এবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল হলেও আমরা আশাবাদী। যদি আমরা দুর্নীতির যথাযথ প্রমাণ দিতে পারি, তাহলে সেই অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।