প্রস্তাবিত বাজেট সংস্কারবিমুখ সাম্যবিরোধী

প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সংস্কারবিমুখ ও সাম্যবিরোধী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রত্যাশার বাজেট হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে। একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট প্রণয়নের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বাজেটে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদে (কেবিনেট) অনুমোদন ছাড়াই বাজেটটি এসেছে।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ : অবহেলিতরা কী পেয়েছে’ শীর্ষক বহুপক্ষীয় অংশীজন বৈঠকে গতকাল এমন মন্তব্য করেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

দেবপ্রিয় বলেন, এ বাজেটে ভুলভ্রান্তি আছে। এ বাজেট সংস্কারবিমুখ। বাজেটের ভেতর দিয়ে সংস্কারের ধারণার চেতনা আমরা সামনে এনেছিলাম। এ সরকার নিজে আমাদের দিয়ে যে কাজগুলো করিয়েছিল সেগুলোর প্রতি তারা বিশ্বস্ত থাকেনি। এ বাজেট সাম্যবিরোধী হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত একটা বড় প্রত্যাশার বাজেট ছিল। একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে সরকার এসেছে। বৈষম্যবিরোধী চেতনার ভেতর দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এটা গতানুগতিক বাজেট থেকে ভিন্ন কিছু হবে, এ রকম বড় প্রত্যাশা ছিল। এর বিপরীতে বলা যায়, এটা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশার বাজেটে পরিণত হয়েছে। প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গে হতাশা এসেছে। কারণ আমাদের আকাক্সক্ষা ভিন্ন ছিল, আমরা দেখেছি অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট গতানুগতিক হয়েছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অস্থায়ী একটা সরকার। এর কাছ থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু যেহেতু গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার এসেছে, সেজন্য কিছু পরিবর্তনের সূচনা এ সরকারের মাধ্যমে হবে, এটাই প্রত্যাশা ছিল। সেটার একটা প্রতিফলন আমরা বাজেটে আশা করেছিলাম।’

সংলাপে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার বরাদ্দ বাস্তব মূল্যস্ফীতির তুলনায় কমে গেছে।’ ‘বয়স্ক ভাতা ৬০০ টাকা থেকে মাত্র ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা করা হয়েছে। অথচ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় তা ৯০০ টাকার মতো হওয়া উচিত ছিল। ফলে প্রকৃত অর্থে সামাজিক নিরাপত্তার বলয় সংকুচিত হয়েছে।’

আইসিএমএবির সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেট আজ বিপর্যস্ত। সরকার বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এতে বাজারে আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ছে।’ গবেষক জিয়া হাসান বলেন, ‘বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে গেছে। মূল্যস্ফীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভোক্তা চাহিদায়। অথচ বাজেট প্রস্তাবে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়নি।’

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘অপচয় ও দুর্নীতি যদি কমানো যায়, তাহলে অবহেলিত মানুষ বাজেট থেকে কিছু পেতে পারে।’ এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন সুবিধা বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি হয়। এটি রোধ করার ওপর জোর দেন তিনি। এর পাশাপাশি শিল্প সম্প্রসারণের জন্য জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে সরকার যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চলকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে, সেগুলোর জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন বিজিএমইএ সভাপতি।

তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী সঞ্জিবনী সুধা বলেন, ‘বাজেটে আমাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও তা বাস্তবায়ন হয় না। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় আমাদের রাস্তায় হাত পাততে হয়। এমনকি বৈষম্যের শিকার হয়ে আমি নিজেই ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছি। সরকার ও প্রতিষ্ঠান কেউই আমাদের পাশে দাঁড়ায় না।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র গবেষণা ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বাজেট বিশ্লেষণে দেখান, অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয় এবং এর বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে গভীর প্রশ্ন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটকে সুযোগ হারানোর (মিস অপরচুনিটিস) বাজেট বলা যায়। বাজেটে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বেশ বড় একটা ফারাক দেখতে পাচ্ছি। মূল সমস্যাটা হলো, পুরনো বাজেটের কাঠামোর মধ্যেই নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বাজেটে যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।’

সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে কিছু পুনর্গঠন হয়েছে, কিন্তু খুব বড় ধরনের কোনো পুনর্গঠন দেখা যায়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ হয়েছে, এটাও অনেক কম। অথচ বাজেটে এবার একটা ভিন্ন কিছু করার সুযোগ ছিল।’

অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকারীরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং ন্যায্যতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আহ্বান জানান।