জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধির খসড়া-২০২৫ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও নতুন সংযোজন এসেছে। গুরুতর অপরাধে প্রার্থিতা বাতিল, পরিবেশবান্ধব প্রচার, পোস্টার নিষিদ্ধকরণ, বিলবোর্ড অনুমোদন, শব্দসীমা নির্ধারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধসহ বেশ কয়েকটি বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনুমোদন দেওয়া হয়েছে টেলিভিশনসহ অন্যান্য মিডিয়ায় ডায়ালগে অংশগ্রহণের বিষয়েও।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কমিশনের সপ্তম সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। নির্বাচন কমিশনার বলেন, এবারের আচরণবিধিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে এবং পূর্ববর্তী কিছু বিধান সংশোধন করা হয়েছে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের করা যাবে টিভি ডায়ালগ বিধান আরপিওর ৯১(ঙ) ধারা অনুযায়ী এবার আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। তিনি জানান, পোস্টার ব্যবহারের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে বিলবোর্ড, ব্যানার, হ্যান্ডবিল ও অনলাইন মাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবেও এসব ছিল।
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ব্যানার ও ফেস্টুনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রার্থীর ছবি ও প্রতীক থাকতে পারবে। তবে সেখানে রঙের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কিছুটা কঠিন হতে পারে। এর বাইরে প্রচারণায় সাদাকালো প্রচারের বিধানটি বহাল থাকবে। সরকারি ব্যক্তি ও সম্পদের ব্যবহারে কঠোরতা আরও বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ফ্যাসিলিটি যেমন সার্কিট হাউজ, ডাকবাংলো, রেস্ট হাউজ ব্যবহারে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র তালিকায় আনা হয়েছে।
নির্বাচনে পরিবেশ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ইসি বলেন, প্রচার-প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। ভোটার সিøপ চালুর বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। টি-শার্ট, জ্যাকেট ইত্যাদি ব্যবহারে আগে বিধিনিষেধ ছিল, সেটি শিথিল করা হয়েছে।
অস্ত্রের সংজ্ঞায় দেশীয় অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে এবং এটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, আগে শব্দমাত্রার ওপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। এবার আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শব্দসীমা ৬০ ডেসিবল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রচারণার সময়সীমা তিন সপ্তাহ থাকবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের কোনো সভাপতি বা সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বলেন, প্রার্থী হতে চাইলে তাকে আগেই এসব পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে কাজ করেন। এটি নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের মধ্যেও ছিল।
কমন প্ল্যাটফর্ম থেকে একজন প্রার্থী তার ইশতেহার ঘোষণা করতে পারবেন উল্লেখ করে এই ইসি বলেন, টেলিভিশনসহ অন্যান্য মিডিয়ায় ডায়ালগে অংশগ্রহণের বিষয়েও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি আসনে রিটার্নিং অফিসারদের তত্ত্বাবধানে সব প্রার্থী এক জায়গায় এক দিনে তাদের ইশতেহার পাঠ করবেন। সব আসনে এক পদ্ধতিতে এটি হবে। বিধিমালা লঙ্ঘনের শাস্তির ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ছিল, এখন তা ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এটি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী করা হয়েছে। আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকারনামা নতুনভাবে সংযোজিত হয়েছে। এটি দল ও প্রার্থী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। তবে এর অনেক বিষয় আরপিও সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল। এটি শিগগিরই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যেখানে ওপরেই উল্লেখ থাকবে ‘আরপিও সংশোধন সাপেক্ষে’। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও সংশোধন সাপেক্ষে হবে এটি। তবে সংসদ নির্বাচনের প্রচারে পোস্টার থাকছে না।
পোস্টারের বিকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের প্রচারে পোস্টার থাকবে না, পরিবর্তে বিলবোর্ড, ব্যানার, হ্যান্ডবিল ও অনলাইনে প্রচার চালানো যাবে। বিদেশি অর্থায়নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করা যাবে না। তিনি জানান, দল ও প্রার্থী উভয়ে একটি হলফনামা জমা দেবেন, যেখানে তারা এই আচরণবিধি মেনে চলবেন বলে অঙ্গীকার করবেন।