স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বারোপ

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার যে বাজেট দিয়েছে, তা অত্যন্ত গতানুগতিক। এই গতানুগতিকতা পরিহার করে একটি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন সাধনে বাজেটকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটি আরও বাড়ানো দরকার ছিল। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দও অপ্রতুল। আর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটিও পর্যাপ্ত নয়। বাজেটে এসব বিষয় পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তী কমিটির উদ্যোগে গতকাল ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাজেট বিতর্ক : প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ’ শীর্ষক সেমিনার এবং নীতিবিতর্কে বক্তারা এমন মত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তী কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্। একই কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মডারেটর হিসেবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত বাজেট আপাতদৃষ্টিতে গতানুগতিক মনে হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা নির্ধারণ করতে পারে বাজেটের আয়প্রবাহ কোন উৎস থেকে আসবে, আর কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কোন কোন খাতে অর্থ ব্যয় হবে।

আলোচনাপর্যায়ে ঘোষিত বাজেটের ৯টি দিক নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবী ও নীতিনির্ধারকরা। বাজেট প্রবন্ধে ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির ঘোষিত বাজেটের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যার হিসাবে আরও স্বচ্ছতা থাকা উচিত বলে মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা পরিচালক মো. গুলজার নবী বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান জিডিপির আয়তন ৪৬৭ বিলিয়ন উল্লেখ করে সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং তৈরি পোশাক খাতের অবদানকে তুলে ধরেন। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাফিউন নাহিন শিমূল প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের উদাহরণ টেনে স্বাস্থ্য বাজেটকে খাতওয়ারি খরচ হিসেবে চিন্তা না করে মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি স্মার্ট বিনিয়োগ হিসেবে গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এ ক্ষেত্রে ঘোষিত বাজেটের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১.৭ শতাংশকে অপ্রতুল মনে করেন।

বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে বিশ্লেষণ করে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক জুলফিকার আলি শিক্ষা ও কর্ম খাতের যে অসামঞ্জস্য বিরাজমান তা দূরীকরণে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় আরও বরাদ্দ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন। তিনি ভারত, নেপাল ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রে আরও বরাদ্দ বৃদ্ধি উচিত বলে মনে করেন। তাছাড়া বর্তমান সরকারের উদ্যোগে শিক্ষা কমিশন না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন।

বাজেটে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন এবং আয় অসমতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দকে অপ্রতুল উল্লেখ করেন বিআইজিডির গবেষণা পরিচালক মুন্সী সুলায়মান। তিনি নতুন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে উৎপাদনশীল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করার প্রস্তাব দেন। নারীর নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্র ও সরকারি সেবায় নারীদের প্রবেশাধিকার এবং নারী খাতে বাজেট হ্রাস পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি।

এ ক্ষেত্রে একটা টোকেন বরাদ্দ এ বাজেটে থাকা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, বাজেটের কয়েকটি খাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাছাড়া বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ সমস্যা তৈরি করবে।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল ডিগ্লোবালাইজেশন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের প্রবণতা উল্লেখ করে বাংলাদেশের জাতীয় শিল্পনীতিতে এর প্রতিফলন না হওয়ার সমালোচনা করেন। রপ্তানিমুখী শিল্পে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া ট্যারিফ হ্রাস ফলপ্রসূ হতে পারে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। জাতীয় বাজেটকে রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল হিসেবে অভিহিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জনগণের অর্থের ওপর জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন এবং বাজেট নিয়ে সংসদীয় কমিটির আলোচনা ও মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

প্যানেল আলোচনা পর্বে বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক গতানুগতিকতা বিবর্জিত সুচিন্তিত বাজেট নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগের সঙ্গে উদ্ভাবনের সমন্বয়ের ওপর জোর আরোপ করেন। আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, যথাযথ সংস্কার ছাড়া ট্যাক্সের অনুপাত বৃদ্ধি পেলে তা শুধু দুর্নীতি ও অদক্ষতার অর্থায়নে পরিণত হবে। অর্থবাজারের সীমানা পেরিয়ে পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা সুদিন ফিরিয়ে আনতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

বাজেটের রাজনৈতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কর্তৃক সাংবিধানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল ও লুণ্ঠনের

অপসংস্কৃতির প্রতি আলোকপাত করেন। সংকুচিত মুদ্রানীতির প্রভাব সামাল দিতে বিনিয়োগের পূর্বশর্তগুলো পূরণ না হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান সরকারি তথ্যের অপ্রতুলতা ও জনসাধারণের সামগ্রিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। দেশের প্রতি ভালবাসা ও দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনো বাজেটই বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি অভিমত দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অরাজনৈতিক হওয়ায় বাজেটের রাজনৈতিক আলোচনা কিছুটা নিরর্থক, তবে এই বাজেট ও এর বাস্তবায়ন গবেষণার বিষয় হতে পারে, যা সময়ের দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। সরকারি সেবা নিতে ঘুষ দিতে হলে জনগণ কেন কর দিতে চাইবে সেই প্রশ্ন রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনু রব্বানী। সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধি ফলপ্রসূ হবে না বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে প্রধান অতিথি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বর্তমান বাজেটটি একটি রাজনৈতিক শূন্যতার বাজেট, যেখানে একই সঙ্গে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং লুণ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত রাজনৈতিক সরকারগুলোর দুর্নীতির চক্রের পরিধি ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান। তারা চান তাদের তৈরি টেমপ্লেটটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার অনুসরণ করবে। তিনি তার অধীন মন্ত্রণালয়গুলোর সাম্প্রতিক কিছু অর্জন, চলমান কর্মকা- ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ নদীপথ সংস্কার, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও গ্রাহকপর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য।