জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটেগত ২৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪ মাস পর আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের নিবন্ধন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) শর্ত অনুযায়ী নিজেদের গঠনতন্ত্রের খসড়া প্রস্তুত করেছে দলটি।
খসড়া গঠনতন্ত্রমতে, পার্টির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। তবে এক্ষেত্রে এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। গত শুক্রবার এনসিপির ষষ্ঠ সাধারণ সভায় এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে এনসিপি সূত্রে জানা গেছে।
নিবন্ধনের প্রায় সব শর্ত পূরণ হওয়ায় আজ রবিবার দলের নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করবে এনসিপি। গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
এনসিপির খসড়া গঠনতন্ত্রমতে, দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী দায়িত্বে থাকবে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট পলিটিক্যাল কাউন্সিল। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে এই কাউন্সিলের সদস্য হবেন। এ ছাড়া তাদের আরও দুই জন মনোনীত সদস্য থাকবে। আর বাকি ১১ জনকে নির্বাচিত করা হবে। নির্বাচিতদের মধ্যে অন্তত ৩ জন নারী সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ হবে ৩ বছর। মেয়াদের সবশেষে ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী কাউন্সিল আয়োজন করার কথা রয়েছে খসড়া গঠনতন্ত্রে।
এনসিপি নেতারা জানান, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ‘রাজনৈতিক পরিষদ’-এর নিকট দায়বদ্ধ থাকবে। আর ‘রাজনৈতিক পরিষদ’ ন্যাশনাল কাউন্সিলের ভোটে নির্বাচিত হবে। রাজনৈতিক পরিষদ সর্বনিম্ন ১১ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ সদস্য বিশিষ্ট হবে। ১১ সদস্য ন্যাশনাল কাউন্সিলের ভোটে নির্বাচিত হবেন; তন্মধ্যে ন্যূনতম তিন নারী সদস্য থাকতে হবে। পদাধিকারবলে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রাজনৈতিক পর্ষদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই পর্ষদের বাকি দুই সদস্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বারা মনোনীত হবেন।
অন্যদিকে, এনসিপির একটি ন্যাশনাল কাউন্সিল থাকবে। এই ফোরাম রাজনৈতিক পরিষদ নির্বাচন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন এবং জরুরি সময়ে কিছু কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার দায়িত্ব পালন করবেন। ন্যাশনাল কাউন্সিল কেন্দ্রীয় কমিটি, অঙ্গ সংগঠনের নির্বাহী কমিটি, জেলা পদমর্যাদার কমিটি থেকে ৫ জন এবং উপজেলা পদমর্যাদার কমিটি থেকে ২ জন সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হবে।
এনসিপি নেতারা জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টির একটি কেন্দ্রীয় কমিটি থাকবে। যা দলের সভাপতি, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদকমন্ডলী, অন্যান্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক সাধারণ সদস্য এবং ক্ষেত্রবিশেষ জেলা সভাপতির সমন্বয়ে গঠিত হবে। কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ হবে ৩ বছর। মেয়াদের শেষ ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে, দলের নিবন্ধনসংক্রান্ত ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সামগ্রিক যোগাযোগের জন্য দলের পক্ষ থেকে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম-আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মুসাকে দায়িত্ব দিয়েছে এনসিপি। কবে নাগাদ এনসিপি তাদের নিবন্ধন পাবে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যাবতীয় নিষয়ে তারা আলোচনা করবেন এবং তাদের সিদ্ধান্তই সংগঠনের সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে।
নিবন্ধনের শর্তসমূহ: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০ ‘ক’ ধারা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে চাইলে তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে। ১. স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে কমপক্ষে একটি আসনে বিজয়। ২. সেসব নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা যেসব আসনে অংশ নিয়েছেন, সেসব আসনে মোট ভোটের ৫ শতাংশ অর্জন। ৩. কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় অফিস থাকতে হবে। দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় জেলা অফিস থাকতে হবে। আর অন্তত ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকার থানায় অফিস থাকতে হবে, যার প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটার থাকবে।
তবে ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’ নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত শিথিলের প্রস্তাব করেছে। নিবন্ধন পেতে ১০ শতাংশ জেলা ও ৫ শতাংশ উপজেলা বা থানায় দলের অফিস এবং দলটির কমপক্ষে পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে হবে- এমন প্রস্তাব দিয়েছে সংস্কার কমিশন।
এদিকে, প্রতিষ্ঠার পরে দুই দফায় ২১৬ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছে এনসিপি। গত সপ্তাহে এনসিপি দেশের ৩৩টি জেলা ও ১২৭টি উপজেলায় সমন্ব^য়ে কমিটি গঠনে সক্ষম হয়। এদিকে দলের গঠনতন্ত্রও প্রস্তুত হওয়ায় এনসিপির নিবন্ধন পেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, আমাদের সাধারণ সভায় গঠনতন্ত্রের খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। আমরা সেটার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সবার সামনে উন্মুক্ত করেছি। পূর্ণাঙ্গ খসড়া গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে আবেদন করার সময় জাতির কাছে প্রকাশ করা হবে। রবিবার আমরা দলের নিবন্ধনের জন্য ইসির কাছে আবেদন করব। ইতিমধ্যে দলের পক্ষ থেকে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ আরও দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত নিবন্ধন পেতে আমরা আশাবাদী।