দেশি-বিদেশির সমন্বয়ে মাদক সিন্ডিকেট

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরেও বদলায়নি মাদক কারবারিদের তৎপরতা। বরং আগের চেয়ে আরও বেড়েছে তাদের অবাধ বিচরণ। গ্রেপ্তার হচ্ছে না কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। দেশি-বিদেশির সমন্বয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই সিন্ডিকেট। বীরদর্পে এলাকায় দাবড়ে বেড়াচ্ছে তালিকাভুক্ত কারবারিরা। সীমান্ত ও বিমানবন্দর দিয়ে আসছে মাদকের চালান। নামকাওয়াস্তে অভিযান করায় কারবারিদের সামলানো যাচ্ছে না। মাদক কেনাবেচার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার ও টেকনাফের মাদক গডফাদার খ্যাত আবদুর রহমান বদি গ্রেপ্তার হলেও সহযোগীরা দেদার কারবার চালাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে ওরা। এরই মধ্যে আগামী ২৬ জুন বিশ্ব মাদকবিরোধী দিবস পালন হবে দেশে। ওইদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত গাঁজাসহ বিভিন্ন রকমের মদ ছিল সাধারণ মাদক। রাজস্ব আদায়ে সরকারি নিবন্ধিত দোকানেও বিক্রি হতো গাঁজা ও আফিম। ওই বছরে গাঁজা নিষিদ্ধ হলে এর জায়গা দখল করে হেরোইন। তবে নিষিদ্ধ হলেও গাঁজার বাজার আরও বেড়ে যায়। কয়েক বছর পর কাশির ওষুধ হিসেবে পরিচিত ফেনসিডিল বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পায়। সেটি ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত ফেনসিডিল ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি। অবশ্য এখনো ফেনসিডিল পাওয়া যাচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। ২০০০ সালের পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে সিনথেটিক ড্রাগ। ২০০৫ সালের পর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সস্তা মাদক হিসেবে ড্যান্ডির প্রচলন বাড়ে। এটি বেশি সেবন করে পথশিশুরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিস্টাল মেথ, ইয়াবা, এলএসডি, ডিওবি, এমডিএমএর মতো মাদকের ব্যবহার বেড়ে গেছে বহুগুণ। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম এসব মাদকের বিস্তার সহজ করেছে। এখন কিশোর ও শিশুদের মধ্যেও মাদক সেবনের প্রবণতা বেড়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিবছর ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালন করা হবে। মাদকদ্রব্য গ্রহণের এবং অপব্যবহার করার প্রবণতা যেভাবে বেড়েছে তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক সুস্থতা বজায় রাখতে, মানুষকে মাদকের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে এই দিবসটি পালন করা হবে। জাতিসংঘ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাদকের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আবারও বেড়ে গেছে মাদক কারবারি ও সিন্ডিকেট সদস্যদের তৎপরতা। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকে বিষয়টি ফুটে উঠেছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। নির্দেশনা পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। মাদক কারবারিদের ধরার পাশাপাশি আরেকটি নতুন তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয় প্রতিটি জেলার এসপিদের। পুলিশ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে নতুন করে মাদক কারবারিদের মধ্যে অনেকেই কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে। ইয়াবা কারবারের আগে কেউ কেউ পকেটমার, ছিঁচকে চোর, রিকশাচালক ছিল। এসব করেই তারা সংসার চালাত। গত এক দশকের বেশি সময় কোকেন পাচারের রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ হয়ে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কোকেন পাচার হয়েছে। ১০ বছর প্রায় ৫০ কেজি কোকেন উদ্ধার হয়েছে। তারমধ্যে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি উদ্ধার হয় সাড়ে ৮ কেজি কোকেন। এই সময় মালাবি, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া ও বাংলাদেশের আটজনকে ধরা হয়। চক্রের প্রধান নাইজেরিয়ার এক নাগরিক। তিনি এখনো তৎপর। 

পুলিশের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড),  গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্র বাংলাদেশে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমবেশি অভিযান চলছে। নতুন করে মাদক কারবারিদের তালিকা হচ্ছে। তালিকার মধ্যে এমন এমন ব্যক্তির নাম আসছে তা চমকে ওঠার মতো। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বেশ কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য রয়েছে। বেশ কিছু জেলায় কিছু গণমাধ্যম কর্মীরও নাম আসছে। পাশাপাশি নব্য গডফাদার হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তারা এক সময় এলাকায় কুলি, পকেটমার, রিকশাচালক, দিনমজুর ও পোনা শ্রমিক হিসেবে কাজ করার তথ্য আছে আমাদের কাছে। এখন তারা বিদেশি কারবারিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশে তৎপরতা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিদেশিদের তালিকাও প্রায় প্রস্তুত করে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে নাইজেরিয়া, ঘানা, ভারত, মিয়ানমারসহ অন্তত ২০টি দেশের কারবারি রয়েছে। তারা সীমান্ত ও বিমানবন্দর দিয়ে মাদকের চালান আনছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসা ও সেবন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে বাইরেই থাকছে। যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষ মাদক কারবারিতে জড়িয়ে পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় যেসব থানা আছে ওইসব থানার পুলিশ সদস্যরাই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে বেশি। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নাফ নদীর খুরের মুখ, ঘোলার পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, মাঝের পাড়া  সৈকত, সাবরাং কচুবনিয়া, হারিয়াখালী, কাটাবনিয়া, খুরের মুখ, আলীরডেইল, মুন্ডারডেইল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেষখালীয়া পাড়া  সৈকত, নোয়াখালী পাড়া, কুনকার পাড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর, শীলখালী, মাথাভাঙ্গা, বড়ডেইল, উখিয়ার ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর, কুমিল্লা, দিনাজপুর. সিলেট, ফেনী, বি-বাড়িয়া, আখাউড়া, ফরিদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনাসহ অন্তত ৩২টি জেলায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা বেশি। নামকাওয়াস্তে অভিযান করায় বীরদর্পে এলাকায় ফিরছে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা। তাদের হাত ধরেই এলাকায় প্রকাশ্য কেনাবেচা হচ্ছে মাদক। প্রতিনিয়ত ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদকের চালান নিয়ে আসছে ওইসব কারবারি। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠক হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে কিছুটা শিথিলতা চলছে। আর এই সুযোগে মাদক কারবারিরা এলাকায় আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এতে আমরা কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন। তবে অভিযান কিন্তু থেমে নেই। আগের চেয়ে আরও জোরালো অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে, মাদকের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে, পুরনোদের পাশাপাশি নতুন কারবারিদের তালিকা করতে হবে, অভিযান কেন আগের মতো হচ্ছে না অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, অভিযানগুলোর ফলোআপ পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তর মনিটরিং করবে। পাশাপাশি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মনিটরিংও করতে হবে। মামলার চার্জশিট এমনভাবে দিতে হবে যাতে প্রকৃত মাদক কারবারিরা পার পেয়ে যেতে না পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে যারা এলাকায় এসেছে বলে পুলিশ-র‌্যাবের কাছে তথ্য এসেছে তারা হলো জেনেভা ক্যাম্পের আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, রিজিয়া, বছিলার নাছরিন, লতা বেগম, সুফিয়া, নসু মিয়া, শেখেরটেকের স্বপন মিয়া, জসিম ওরফে কানা জসিম, আগারগাঁও বিএনপি বস্তির আফরোজা আক্তার হাসি, ফাতেমা, নুরজাহান, আবুল হোসেন লিটন, শামসুননাহার, রনি, কবির হোসেন, জাকির, স্বপন, মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজক্টের জয়নাল, রহিম, বাদশা, সবুজ, রুহুল আমিন, ফেন্সি জয়নাল, মোলা পাড়ার আদর্শনগরে সাইফুল, জুলহাস, আতাউর রহমান কালু, রাসেল, সোহাগ মির্জা, শাহজাহানপুরের শামীম, কালাচাঁদপুরে লোটন, বনানীর বরকত, মহাখালী টিভি গেট এলাকায় হান্নান, বাবু, সাতরাস্তার আবু সাঈদ, রবিউল ইসলাম, ধলপুর সিটি পল্লীর তসলিম, কবির, মাস্টার, আসলাম ও দীন ইসলাম, মুন্সীবাড়িতে পারুল ও মিরাজ, দনিয়া গোয়ালবাড়ির আক্তার ও নদী, বাবুল, নাদিম, মিজান, পুলিশ সোর্স কবির, বেগম, পারুলী, মনোয়ারা, ছাফি, মুরগি টগর, তামান্না, ময়ুরী, স্বপ্না, বেবী, কক্সবাজারের রামুর মোস্তাক মেম্বার, নুরুল মেম্বার, টেকনাফের শাহজাহান, ফেনীর জসিম মিয়া, নুর আহমেদ, মোহাম্মদ নবী, কামাল মিয়া সুমন, কুমিলার মোহাম্মদ মসিন, শাহজালাল মিয়া, চট্টগ্রামের কাশিম আহমেদ, মুরাদ উদ্দিন, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ করিম, আবদুল জলিল, আলী হোসাইন, পাভেল মিয়া, মঞ্জুরুল হক, কাশিম মিয়া, ময়মনসিংহের আবুল হাসান, চুয়াডাঙ্গার হান্নান শেখ, মিথুন, সাফিকুল, সাগর শেখ, মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি এলাকায় সখিনা, বিউটি, সুরাইয়া ওরফে লিপি, সোহেল,  মিরপুর ঝিলপাড় বস্তির নজরুল ওরফে নজু, মিলাত ক্যাম্পের রুস্তম, মিরপুর মাজার রোডের রাজা প্রমুখ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিধপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানিয়েছেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছি। পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি আমরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছি। আগামী ২৬ জুন মাদকবিরোধী র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আছে। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত থাকবেন।