ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাবে শেয়ারবাজারে ধস

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের এক সপ্তাহের মাথায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত শনিবার মধ্যরাতে এ হামলার পরের দিন গতকাল রবিবার বিশ্বের প্রায় সব দেশে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শেয়ারবাজারসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছিল বন্ধ। তবে এদিন খোলা ছিল বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে সূচকের পতন দিয়ে লেনদেন শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। লেনদেন শেষে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৭৬ পয়েন্ট হারিয়ে ৪ হাজার ৬৭৭ পয়েন্টে নেমেছে।

এ সময়ে বাজারে লেনদেনে অংশগ্রহণ করা ৩৯৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের মধ্যে ৩৬৫টি কোম্পানি শেয়ার দর হারিয়েছে। লেনদেন আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৩৩ কোটি টাকা হ্রাস পেয়ে ২৭২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আজ (সোমবার) আন্তর্জাতিক বাজারের কার্যক্রম শুরুর পর যুদ্ধাবস্থার প্রভাব দেখা যাবে।

ডিএসইর বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নিম্নমুখী ছিল এবং আগের কার্যদিবসের তুলনায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। তালিকাভুক্ত ১৯টি খাতের মধ্যে প্রায় সব খাতের শেয়ারের দর কমেছে। হাত বদল হওয়া শেয়ারের মূল্য পরিবর্তনের ভিত্তিতে ৩৯৭টি ইস্যুর মধ্যে ১৬টি ইস্যুর দর বৃদ্ধি ও ৩৬৫টি ইস্যুর দর হ্রাস পেয়েছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৬টির। আলোচ্য সময়ে ব্লক মার্কেটে ২৩ দশমিক ৮ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা মোট লেনদেনের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এসএমই বাজার সূচক (ডিএসএমইএক্স) ১৬ দশমিক ২ পয়েন্ট কমেছে এবং লেনদেন হয়েছে ৪ দশমিক ৬ কোটি টাকা যা গতদিনের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বিদেশের স্টক মার্কেটের সঙ্গে আমাদের মার্কেটের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আমাদের এখানে বিদেশি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী নেই বললেই চলে। এখানে যারা আছেন, তারা সবাই স্থানীয় ও সাধারণ বিনিয়োগকারী। ফলে দেশে এবং বিদেশে যে কোনো ঘটনায় তারা শঙ্কিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। যে কারণে শেয়ারবাজার নেতিবাচক হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা করেছে। এটি সাধারণ বিষয় নয়। তার মানে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে ইরান যদি থেমে যায় তা ভিন্ন কথা। থেমে গেলেও তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে। আর তেল এবং জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দেশে দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। আর আমাদের দুর্বল অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ আমাদের অর্থনীতি আমদানি ও রপ্তানি নির্ভর। এখন ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তাতে বিশ্বে তেল রপ্তানিসহ অন্যান্য পণ্যের জাহাজ চলাচল সমস্যায় পড়বে। এতে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে।

অন্যদিকে রপ্তানি পথে জটিলতার কারণে উন্নত দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে। জাহাজ ভাড়া বাড়বে, তেলের দাম বাড়বে। সময় ও খরচ সব কিছুই বাড়বে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। ফলে মানুষ কম খরচ করবে এবং আমাদের রপ্তানিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিপরীতে আমদানিতে ব্যয় বাড়বে। যা বাজার অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। আর সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের শেয়ারবাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী নির্ভর। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা ‘সিঁদুরে মেঘ’। যে কোনো ঘটনায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যে কোনো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রভাব বাজারে দেখা যায়। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পথে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে। এতে দেশের রপ্তানি ও আমদানি তথা অর্থনীতিতে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। বাজার খুললেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। আইবিকেআরের প্রধান বাজার বিশ্লেষক স্টিভ সোসনিক জানিয়েছেন, এটা মোটামুটি নিশ্চিত, শেয়ারবাজারে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে। তবে তা কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে ইরানের প্রতিক্রিয়া ও তেলের দামের গতি-প্রকৃতির ওপর।