কালো টাকা সাদা বা বৈধ করার যে সুবিধা প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা হয়েছিল, তা বাতিল করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেট পাস করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। ফলে ফ্ল্যাট ও ভবনে বাড়তি কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার বৈধ পন্থা বন্ধ হয়ে গেল। বাজেট পাস হওয়ার আগে এবার এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এ ছাড়া আয়কর, ভ্যাট ও করে সামান্য পরিবর্তন করে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। এ বাজেট আগামী ১ জুলাই কার্যকর হবে।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সে সময় অর্থসচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সামাজিক সুরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ফলে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে ৯১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বাড়তি টাকা ব্যয় হবে মূলত সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ ভাতা প্রদানে। উপদেষ্টা পরিষদ সরকারি কর্মচারীদের ন্যূনতম বিশেষ ভাতা ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা ও পেনশনভোগীদের ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৮১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। সেটিকে বাড়িয়ে ৯১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা করে বাজেট পাস করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বিশেষ কর প্রদানের মাধ্যমে ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান বিলোপ করা হয়েছে। পাবলিকলি ট্রেডেবল কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছে, তাদের ওই আয়ের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করারোপ করা হয়েছে। তবে বিবেচ্য আয়বর্ষে সব প্রকার আয় ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সম্পন্ন করলে ওই কর হার হবে ২০ শতাংশ। অন্য সব পাবলিকলি ট্রেডেবল কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করারোপ করা হয়েছে। বিবেচ্য আয়বর্ষে সর্বপ্রকার আয় ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সম্পন্ন করলে ওই কর হার হবে ২৫ শতাংশ।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়তি কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেই বিধান বাতিল করা হয়েছে। ফলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আর থাকছে না।
অল্প পরিবর্তন আনা হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের কর হারে। প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ শতাংশের স্থলে এটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর কর্তনের হার ৮ শতাংশ, ৬ শতাংশ ও ৪ শতাংশের স্থলে যথাক্রমে ৫ শতাংশ, ৩ শতাংশ ও ২ শতাংশ করা হয়েছে।
মূল্য সংযোজন করের কিছু ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। রিফাইন্ড পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর ৭ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ করা হয়েছে। ঝুট থেকে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত তুলার উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের বিউটি পার্লারের স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর মূসকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বলপয়েন্টের আমদানি পর্যায়ে মূসকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। হার্টের রিং ও চোখের লেন্স আমদানির ক্ষেত্রে আগাম করে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
কাস্টমস শুল্কে যেসব পরিবর্তন এসেছে তার মধ্যে রয়েছে সব ধরনের পেট্রোলিয়ামপণ্য আমদানিতে ট্যারিফ মূল্যের পরিবর্তে ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ক্রুড পেট্রোলিয়ামপণ্যের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ককে কমিয়ে ৩ শতাংশ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নির্ধারিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ককে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা।
সৌরশক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিকে আরও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে সোলার ইনভেন্টরের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে জারি করা হাসপাতাল কর্তৃক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও উপকরণ রেয়াতি সুবিধায় আমদানিসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে আরও ১০টি আইটেম যুক্ত করা হয়েছে। ফলে জনগণের জন্য চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করা যাবে। দেশে মানসম্পন্ন টায়ার উৎপাদনের জন্য টায়ার তৈরির অন্যতম কাঁচামাল টেকনিক্যালি স্পেসিফাইড ন্যাচারাল রাবারের (টিএসআর) আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।