স্বাধীন বিচার বিভাগ গড়তে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

অতীতের সরকারগুলো বিচার বিভাগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘এ বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় হলে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হবে, হস্তক্ষেপমুক্ত হবে বিচার বিভাগ, নিশ্চিত হবে স্বাধীনতা ও জবাবদিহি। স্বাধীন ও দক্ষ বিচার বিভাগ গড়তে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

গতকাল রবিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও দক্ষতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে ড. ইউনূস বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা আর কখনো আসবে না। এ সুযোগ হারাতে দেওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই শহীদদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। জুলাই গণহত্যার বিচারের জন্য আজ জাতি ঐক্যবদ্ধ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে যে সংস্কারগুলো অসম্পূর্ণ ছিল, তা পূরণ করাই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য। এ সংস্কারের সুযোগ এনে দিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আজকে আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ আমরা সামনে জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর উদযাপন করব। আমাদের তরুণরা রক্তের বিনিময়ে তাদের প্রত্যাশা জানিয়েছে এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। এসব কিছুই সম্ভব যদি শুরুটা সঠিকভাবে করা হয়।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছে। হাজারো মানুষের ত্যাগের মধ্য দিয়ে হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রমাণ। এ জাগরণ এসেছিল হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে, যেখানে আরও কয়েক হাজার হতাহত হয়েছে। এখন আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের ওপর কিছু দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এ দায়ভার শেষ তখনই হবে, যখন জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থান ক্ষমতার পালাবদলের জন্য হয়নি। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত যে গভীর আধিপত্য ও পক্ষপাতিত্ব রয়ে গেছে, তা ভেঙে ফেলার তীব্র আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে এটি ইন্ধন পেয়েছিল। বিপ্লবের প্রতি আমাদের লক্ষ্য আমাদের সব কর্মের দ্বারা পরিচালিত একটি ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সাম্য ও মর্যাদা সৃষ্টি করা। এ অভ্যুত্থান পুরনো শৃঙ্খলা ভেঙে এমন একটি রাষ্ট্রকে উন্মোচিত করতে চেয়েছিল, যাতে কোনো একক দল কখনো মরিয়া বা কর্র্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে না পারে। এ আশা এবং অনুপ্রেরণা এখন আমাদের পুনরুত্থানের কঠিন কাজে সন্তুষ্টি জাগায়।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘চলমান সংস্কারের একজন স্টেকহোল্ডার হিসেবে আমাদের যা করার কথা, আমরা তা-ই করছি। যখন আমরা সংস্কারের কথা বলি, তখন কিন্তু অল্প কোনো কিছুর কথা বলি না, যেটি সময় এবং ক্ষমতার চাপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমরা সেসব কাজের কথাই বলছি যেগুলো বিগত ৫৪ বছরে করা হয়নি। আমরা সেই পরিবর্তনের কথা বলি, যা শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। আমাদের ওপর যে সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেসব কাজের ফলে স্বৈরাচারতন্ত্র ভেঙে যাবে।’

প্রধান বিচারপতি বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন এবং ইউএনডিপি, বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার।

দুই পর্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারের প্রথম পর্বে দুপুরে দুটি প্যানেল অধিবেশন হয়। বিকেলে দ্বিতীয় পর্বে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণসহ বিচারসেবা প্রদানে দক্ষতা বৃদ্ধিতে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়।

আলোচনায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ, আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ আলী ও বিচারপতি জাফর আহমেদ, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক রুশদ হক ও মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, কমনওয়েলথের সহকারী মহাসচিব অধ্যাপক লুইস জি ফ্রানসেস্কি, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব শেখ আবু তাহের, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, বিচারব্যবস্থা-সংক্রান্ত ইউএনডিপি এক্সপার্ট ক্রিস্টোফার ডেকার, ইইউর রাষ্ট্রদূত এইচ ই মাইকেল মিলার এবং সুইডেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মারিয়া স্ট্রিডসম্যান।

সেমিনারে দেশের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা এবং গণতন্ত্র রক্ষায় বিচার কাঠামোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।