অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট দিয়েছে, তা খুবই গতানুগতিক। বাজেটের মৌলিক কাঠামোতে কোনো পরির্বতন আনা হয়নি। বাজেটে মূল্যস্ফীতির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা খুবই উচ্চভিলাষী। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও অর্জনযোগ্য নয়। আর বাজেটের পদক্ষেপসমূহ এর মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ প্রস্তাবিত বাজেট।
রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বাজেট সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটা বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিহীন এই বাজেট। বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জনমানুষের জীবন সংলগ্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে যথাযথ বরাদ্দ বা পদক্ষেপ নেই। উল্টো উন্নয়ন বাজেটে ভৌত অবকাঠামো (ভবন) নির্মাণেই সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটের মূল দর্শন যাদের বেশি আয় তাদের থেকে বেশি কর নিয়ে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়াদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যয় হবে। অথচ আমাদের বাজেটের তিন ভাগের দুই ভাগই পরোক্ষ কর।’
বাজেটের ওপর মতামত দেওয়ার জন্য বেশি সময় না দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পর ঈদের লম্বা ছুটি ছিল। এরপর মাত্র ৫ কার্যদিবস সময় পাওয়া গেল এটির ওপর মতামত দেওয়ার জন্য। এটি অত্যন্ত স্বল্প সময়। সরকারের উচিত ছিল আরও বেশি সময় ধরে বাজেটের ওপর মানুষের মতামত নেওয়া।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাস্তবতার নিরিখে এই বাজেট বড়। তবে অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। এছাড়াও বাজেট পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল। এটি বাজেটের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, বাজেটের লক্ষ্য সম্পদ পুনর্বন্টন। অর্থাৎ ধনীদের কাছ থেকে কর নিয়ে গবিবদের দেওয়া হবে। কিন্তু পরোক্ষ কর বাড়লে দরিদ্রদের ওপর করের বোঝা চাপে।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব বাড়বে না। সংস্কারের ক্ষেত্রে একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দরকার। তিনি বলেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট আকারে ব্যতিক্রম। বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ প্রস্তাব করা হয়েছে। রয়েছে কর ছাড়, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও প্রণোদনা এবং ক্ষতিকর কার্যক্রমে উচ্চ কর আরোপ। তবে, প্রস্তাবিত বাজেটে চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট উপাদানগুলো যুক্ত করতে পারলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি আনতে পারত। অন্যদিকে কিছু রাজস্ব পদক্ষেপ বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য ‘একটি সমতাভিত্তিক ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠন’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, সিপিডি বাজেট বাস্তবায়নকে দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। এই প্রেক্ষাপটে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির জন্য বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘আমরা অনেক অস্বস্তিকর সময় পার করছি। বর্তমানে আমরা দেখছি খুব সুন্দর সুন্দর মডেল তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে একটা মডেল হচ্ছে, কেউ লুট করলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই লুটের টাকা আবার ব্যাংকে পৌঁছে দিয়ে আসে। ব্যাংকগুলো লুট করেছে, আর আমরা তার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি চড়া সুদহার দিয়ে। আমার থেকে আপনি (সরকার) বাড়তি টাকা নিয়ে এই চুরির টাকার ভর্তুকি দেবেন, এটা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত একটা ব্যাংকের কর্মকর্তার জেল হয়নি, একজন গ্রাহকেরও (দোষী) জেল হয়নি। কারণ, যার কাছে টাকা, যে যত বড় চোর, সে তত বড় স্বচ্ছ এটাই আমরা প্রতিফলন দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, আগে মেগা প্রকল্পে বড় বাজেট দিয়ে মেগা লুটপাট করা হতো। কিন্তু এখন তো আওয়ামী লীগ নেই। তাহলে এখন যে বড় বাজেট দেওয়া হচ্ছে, সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের প্রতি রেগে যাওয়ার সময় এসেছে। তবে সেটি ‘অযৌক্তিক নয়’, বরং ‘সমাজ পরিবর্তনের জন্য পবিত্র রাগ’ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘এই সরকারের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি, যেটাকে বলা যায় ‘নিউ ফর্ম অব কুম্ভকর্ণ সিনড্রোম’ শোনা হচ্ছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া নেই। যদিও এসব বলায় সরকার রাগ করতে পারে।’
হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘সংস্কারের সম্পূর্ণ অগ্রাধিকার এখন কিছু সাংবিধানিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। অথচ আমরা যে সংস্কারের কথা বলেছিলাম, তা ছিল বিচারব্যবস্থার দৈনন্দিন বাস্তবতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কার নিয়ে। কিন্তু এগুলো এখন পুরোপুরি দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘‘এটি একটি ‘ট্রাডিশনাল, প্রুডেন্ট’ বাজেট হলেও ‘ইমপ্যাক্টফুল’ নয়। বাজেটে প্রাইভেট সেক্টর, শ্রমিক খাত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কিছু নেই; রয়েছে বৈষম্য। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নেও তেমন কিছু দেখা যায়নি।’’ তার মতে, আগামী ডিসেম্বরেই বাজেটের একটি মধ্যবর্তী পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদে চারজন অর্থনীতিবিদ রয়েছেন। কিন্তু সবাই অর্থনীতিবিদ হলেও কাঠামোর বাইরে যেতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। শুধু টেকনিক্যাল দক্ষতা যথেষ্ট নয়।’
কর বহির্ভূত রাজস্ব খাতে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলার পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘এক ধরনের উচ্চাভিলাষ বাদ দিয়ে বাজেটে আরেক ধরনের উচ্চাভিলাষ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এটি অবকাঠামোগত বাজেট। কিন্তু সক্ষমতার ঘাটতি দূর করার বিষয়ে তেমন কিছু নেই।’
দেশের অর্থনীতিতে সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর। এর মধ্যে অন্যতম ‘স্পিড চ্যালেঞ্জ’ অর্থনীতি কী গতিতে এগোবে, তা নিশ্চিত করা। ‘প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আগে থেকেই অনেক বেকার বসে আছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার মান উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা হচ্ছে, কিন্তু মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। এটি ঠিক না হলে বাংলাদেশ গতি পাবে না।’
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘পরশু চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী জানালেন, তিনি ১৭০ জন আসামির একটি মামলার ৯৫ নম্বর আসামি। এই ‘গায়েবি মামলা’র সংস্কৃতি ব্যবসায়ী সমাজে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।’’ বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয় একা নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পুরো সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন ‘গ্রোথ ড্রাইভার’ খুঁজে বের করার ওপরও জোর দেন হোসেন জিল্লুর। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালক হবে কৃষি। ফার্মাসিউটিক্যালস ও আইসিটিতে সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিই হবে মূল চালক। সে জন্য এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি কমাতেও এখনই পদক্ষেপ জরুরি। চিন্তার উত্তরণের সময় এসেছে।’
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা, তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এনামুল হক খান ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সোশ্যালিস্ট লেবার ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা।