ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের আবাসন সংকট কমাতে উত্তরায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রকল্পটির আওতায় মোট ৭ হাজার ৫৪৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। কিন্তু ভবন নির্মাণ ও সড়ক নির্মাণে যে ব্যয় ধরা হয়েছে তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বাড়তি ব্যয় দেখিয়ে অর্থ লোপাটের ছক কষা হচ্ছে বলে সন্দেহ পরিকল্পনা কমিশনের। কমিশন এতে আপত্তি জানিয়েছে।
রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পটির ডিপিপি মূল্যায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছে। রাজউক নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বল্প খরচে নগরবাসীর মধ্যে আবাসিক ফ্ল্যাট হস্তান্তর। কিন্তু প্রকল্পের যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তাতে স্বল্প মূল্যে ফ্ল্যাট সরবরাহ করা কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকল্পিত প্রকল্পটির খাতভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তরায় ১৭৯ একর জমির ওপর এটি হবে। জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৫৪৩ কোটি টাকা। ৭ হাজার ৫৪৪টি আবাসিক ফ্ল্যাটের জন্য মোট ৯২ লাখ ৭ হাজার ৪১৮ বর্গমিটার ভবন নির্মাণ করা হবে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। প্রতি বর্গমিটার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ২৭৫ টাকা। এটি স্বাভাবিক নির্মাণ ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সময়ে গৃহীত জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় এর চেয়ে অনেক কম। ওই প্রকল্পে ৮০৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ২৬ হাজার ২৯৯ বর্গমিটার ভবন নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৫ কোটি টাকা। প্রতি বর্গমিটারে নির্মাণ ব্যয় ৫৩ হাজার ৪৪৫ টাকা। যদিও এ নির্মাণ ব্যয়ও বর্তমান বাজার মূল্যের বিচারে বেশি, তবে রাজউক উত্তরা প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।
এমন অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন যে মতামত দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণকাজে যে ব্যয় ধরা হয়েছে সেটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট সিডিউলের তুলনায় বেশি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট সিডিউল অনুযায়ী ব্যয় প্রাক্কলনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আরও কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে কমিশন। যেমন প্রকল্প এলাকার সড়ক নির্মাণব্যয়। প্রকল্প এলাকায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ১২৭ বর্গমিটার রাস্তা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯ কোটি টাকা। প্রতি বর্গমিটারে নির্মাণ ব্যয় ৫ হাজার ৩১৮ টাকা। এ ব্যয়কেও অস্বাভাবিক বলেছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রেট সিডিউল অনুযায়ী ব্যয় প্রাক্কলনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে গত বছর তীব্র আন্দোলন হয়েছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সেই অবস্থা চলতে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন, দুর্নীতি রোধ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন সময়ে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। তাদের সহায়তায় অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। এর থেকে উত্তরণে কী করা উচিত জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের আন্দোলনে মূলত সরকারের ওপরের পর্যায়ে তথা মন্ত্রিপরিষদে পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সরকারের প্রশাসনিক কাজ যারা করেন, তারা তো আর পরিবর্তিত হননি। ফলে তাদের কাজের ধরনে পরিবর্তন আসেনি। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। সে ধরনের উদ্যোগের অভাব রয়েছে।’