মানবতাবিরোধী অপরাধ

হাসিনাসহ তিনজনের অভিযোগ গঠনের শুনানি ১ জুলাই

জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি হবে আগামী ১ জুলাই। অন্য দুই আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শুনানির জন্য এদিন ধার্য করে।

ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। গতকাল পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করতে রাষ্ট্রের পক্ষে আইনজীবী নিযুক্তের সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাইব্যুনাল। 

গতকালই ঢাকা বিশেষ জজ আদালত-৮-এর সাবেক বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আমির হোসেনকে তাদের পক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করে ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় কারাগারে থাকা চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গতকাল ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।

এর আগে গত ১২ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ১ জুন তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে ৮ হাজার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। পাঁচ অভিযোগের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষী করা হয় ৮১ জনকে। শুনানিতে অপরাধের প্রধান আসামি ও ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার আরজি জানায় প্রসিকিউশন। শুনানির পর ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।

এরপর ১৬ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক আদেশে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়। এরপর দুটি জাতীয় দৈনিকে এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তবে, দুজনের কেউই এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে হাজির কিংবা আত্মসমর্পণ করেননি। গতকাল শুনানির পর প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ১ জুলাই চার্জ হেয়ারিং (অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি) হবে।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় ২ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ : গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় ছয় আন্দোলনকারীকে পোড়ানোর ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের জন্য আগামী ২ জুলাই দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গতকাল প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়।

এ মামলায় গত ১৯ জুন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনে প্রতিবেদন দেয় বলে গতকাল প্রসিকিউটররা জানান। এতে ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। শুনানিতে প্রসিকিউশন ১১ জন আসামির নাম উল্লেখ করে। তারা হলেন ঢাকা-১৯ আসনের (সাভার-আশুলিয়া) সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ, ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উত্তরের সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দীন, শেখ আবজালুল হক, বিশ্বজিৎ সাহা, কামরুল হাসান ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার। এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার।

আসামিপক্ষে আইনজীবী নিয়োগে মানদ- থাকতে হবে : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে আসামিরপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স কাউন্সিল) নিয়োগের ক্ষেত্রে মানদ- থাকতে হবে, যাতে তিনি যথাযথ ও স্বাধীনভাবে আসামির প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। গতকাল ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলায় সম্প্রতি তার (শেখ হাসিনা) পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটুকে নিযুক্ত করে ট্রাইব্যুনাল। তবে ফেসবুকে শেখ হাসিনার ফাঁসি চেয়ে কিছুদিন আগে পোস্ট দিয়েছিলেন আমিনুল গনি টিটু।

এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ক্যাডম্যান বলেন, ‘কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এটি আদালতের বিষয়, প্রসিকিউশনের নয়। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে মানদ- থাকতে হবে। বিচারকদের মানদ-ের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, এটা তাদের দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যাতে তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে যথাযথ ও স্বাধীনভাবে আসামির প্রতিনিধিত্ব করেন।’ আমিনুল গনি টিটু এ পদে যথার্থ কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি প্রসিকিউশনের বিষয় নয়। বিচারকদের বিষয়। যদি কোনো আসামি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের কাছে বিষয়টি তাকে উত্থাপন করতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে টবি ক্যাডম্যান আরও বলেন, ‘প্রথমত, কোনো আসামি ট্রাইব্যুনালে আসতে চান না, কিন্তু তার অধিকার রক্ষায় আইনজীবী নিয়োগ দিতে চান, সেটি একটি বিষয়। আবার যদি কোনো আসামি বিচার প্রক্রিয়া বর্জন করেন, তখন বিচারকদের দায়িত্ব থাকে সেই আসামির অধিকার রক্ষায়, যাতে তিনি ন্যায়বিচার পান। তখন আসামির অধিকার রক্ষায় যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিচারকদের বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়।’