শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার বেশিরভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। প্রতিটি ভূমি অফিসে দালাল-সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে ঘুষ লেনদেন। কিছু দলিল লেখক ও স্থানীয় কিছু চতুর প্রকৃতির লোকই হচ্ছে এই দালাল-সিন্ডিকেটের সদস্য। জমিজমা রেজিস্ট্রি করতে যে কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, তার সঙ্গে ভূমি অফিসের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শ্রীবরদীর খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ লেনদেনের একাধিক ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এরপরই ভূমি অফিসের দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নামজারি, ভূমিবিষয়ক বিভিন্ন প্রকারের সার্টিফিকেট প্রদান, ভূমিবিষয়ক অভিযোগ নিষ্পত্তি, অর্পিত সম্পত্তির লিজ নবায়নের কাজে টাকা দিতে হয় মাঠ পর্যায়ের এসব ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে।
দোকান থেকে আবেদন করে অফিসে গিয়ে আবেদনের বিষয়টি জানানোর প্রথম ধাপেই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। এ ছাড়াও কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় হাজার হাজার টাকা গুনতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। আবার টাকা দেওয়ার পরে কাগজ দেওয়া নিয়ে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।
সাংবাদিকদের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা স্থানীয় দালাল ও সেবাগ্রহণকারীর কাছ থেকে ঘুষের টাকা গুনে নিচ্ছেন। টাকা গণনা শেষে নিজের ব্যক্তিগত পার্সে ঢুকিয়ে রাখেন। সেই ভিডিওর কথোপকথনে সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়াও অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ টাকা গুনে সেই কর্মকর্তাকে টাকা দিচ্ছেন। অনেক যতেœ টাকা গুনে নিজের পার্সে রাখছেন এবং দুদিন পর তাকে এসে কাগজ বুঝে নেওয়ার কথা বলছেন। এই ভিডিওগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাইতে গেলে স্থানীয় সেই দালালরা সাংবাদিকদের খবর প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাড়ে সাত মাস আগে যোগদান করা এই কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই করেন না। নামজারি কিংবা খারিজ নিতে তাকে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা। শুধু তাই নয়, জমিজমার বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলেও তাকে দিতে হয় ঘুষ। মূলত জমিজমা সংক্রান্ত যেকোনো কাজে ঘুষ নেওয়া যেন তার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তিনি নন, উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চিত্র প্রায় একই। প্রতিটা অফিসে রয়েছে দালাল সিন্ডিকেট। ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে প্রতি পদে পদে দিতে হয় ঘুষ, না দিলে নানা ঝামেলায় পড়তে হয় সেবাপ্রার্থীদের।
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট ঘিরে ছাত্রজনতার আকাক্সক্ষা ছিল, সরকারি সেবায় কোনো বৈষম্য হবে না। কোনো দপ্তরে ঘুষ-দুর্নীতি চলবে না। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং সেবাপ্রার্থীরা বাড়তি টাকা দিয়েও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। আমি এই এলাকার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আহ্বান জানাব, যেন ভূমি অফিসগুলোর দিকে নজরদারি রাখা হয়। প্রকৃত সেবা গ্রহণকারীরা যেন সেবা পায়।’
স্থানীয় পল্লীচিকিৎসক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি একটি কাজের জন্য দুই বছর ধরে সরকারি খরচের চেয়ে অনেক বেশি টাকা বাড়তি দিয়েও ঘুরতেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। আগের কর্মকর্তা চলে গেছেন, তাই এখন নতুন কর্মকর্তার কাছেও পাত্তা পাচ্ছি না।’
লঙ্গরপাড়ার কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমি জমি খারিজ করার জন্য গিয়েছিলাম। আমার কাছে নায়েব সাহেব ১০ হাজার টাকা চাইছে। আমি টাকাও দিবার পাই নাই, খারিজও করবার পায় নাই।’
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন সারোয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘দুর্নীতি মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন সমাজের মধ্যে বাজে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। সরকারি ফির বিপরীতে বাড়তি টাকা নেওয়া আইনবিরোধী কাজ এবং মানুষের ওপর একটা জুলুম। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিষয়টি কঠিন হাতে দমন করতে হবে।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানার কার্যালয়ে গেলে তিনি বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ বলেন, ‘জনগণের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সর্বপ্রকার সেবার বিনিময়ে সরকার ফি নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং সেই তালিকা জনসম্মুখে টানিয়ে রাখার নির্দেশও দেওয়া আছে। এর বাইরে যদি টাকা নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’