টেস্ট মর্যাদার রজতজয়ন্তী

সিকি শতাব্দীর পথচলায় প্রাপ্তি সামান্যই

টেস্ট ক্রিকেটে ২৫ বছর হয়ে গেল বাংলাদেশের। এই ২৫ বছরে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলেছেন ১০৭ জন ক্রিকেটার। বাংলাদেশ ১৫৪ টেস্ট খেলেছে এরই মধ্যে, ১৫৫তম টেস্টটি চলমান। দীর্ঘ ২৫ বছরের পথচলা এবং দেড়শোর বেশি টেস্ট খেলার পরও বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট খুব একটা এগোয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব যেমন আছে, তেমনি আছে সাংস্কৃতিক ঘাটতিও। টেস্ট ক্রিকেট এখনো বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে, এমনকি ক্রিকেটারদের কাছেও সর্বোচ্চ প্রাধিকারের জায়গায় নেই। এমনকি ক্রিকেট প্রশাসকরাও একই মানসিকতা ধারণ করায় টেস্টের আভিজাত্যের মূল্য বাংলাদেশ দিতে পারেনি উপযুক্তভাবে।

ক্রিকেট সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ক্রিকেট ক্লাব এবং আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা। বাংলাদেশের  ক্লাব ক্রিকেটকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়নি ২৫ বছরেও। বাংলাদেশের বা বলা ভালো ঢাকার ক্লাবগুলো, এখনো ৫০ ওভারের সংস্করণেই প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে, হালফিলে টি-টোয়েন্টি সংস্করণেও কয়েক মৌসুমে লিগ হয়েছে বিশেষ কারণে। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সঙ্গে ক্লাবের সম্পর্ক রয়ে গেছে আদায়-কাঁচকলায়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা মুখে অনেকবার বললেও বিসিবির কর্তাব্যক্তিরা ক্ষমতার মুঠো আলগা হয়ে যাওয়ার ভয়ে স্বাধীন আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা দাঁড়াতে দেননি। জাতীয় লিগের দলগুলো গঠন করে দেওয়া হয়েছে ঢাকা থেকে। ফল, জাতীয় লিগের কোনো মানদণ্ড দাঁড়ায়নি। একজন খেলোয়াড়ের জন্ম নারায়ণগঞ্জে, অনুশীলন করেন ঢাকার ধানমণ্ডির ক্লাবে, দুই মৌসুম খেলেছেন বরিশাল বিভাগের হয়ে আর এখন খেলছেন সিলেট বিভাগে- এ রকম উদাহরণ পাওয়া যাবে ভ‚রি ভ‚রি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার সুযোগটাও হয়ে গেছে সস্তা। জাতীয় দলের গন্ধ গায়ে লেগে গেলে তারকা ক্রিকেটাররা তাদের নিজ বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে চান না। তাদের ছাড়াই চলে জাতীয় লিগÑ ফলে প্রতিদ্ব›িদ্বতার মান খুবই নিচু। এনামুল হক বিজয় সবশেষ মৌসুমে জাতীয় লিগে করেছেন ৭০০ রান, এরপর নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে দুটো চারদিনের ম্যাচ খেলে কোনো হাফসেঞ্চুরিও করেননি। নির্বাচকরা তাকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে ডেকেছেন, শ্রীলঙ্কা সফরেও রেখেছেন। ০, ৪ ও ০ করে এনামুল বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মানটা কোথায়।
২৫ বছর হয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো ২ টেস্টের বেশি এক সিরিজে খেলতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টানা ৩টা টেস্ট খেলার মতো ফিটনেসই নেই। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ৩টা চক্র শেষ হলো, বাংলাদেশ একটিও ৩ ম্যাচের সিরিজের আয়োজন করতে পারেনি কোনো দলের সঙ্গেই। চতুর্থ চক্রেও নেই কোনো ৩ ম্যাচের সিরিজ, ফলে বছরে ৪ থেকে ৬টার বেশি টেস্ট খেলার সুযোগই হয়ে ওঠে না বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। এই বছর যেমন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মাত্র দুটো টেস্ট, একটি শেষ অন্যটি চলমান। এর বাইরে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে দুটো হয়ে গেছে, সামনে আছে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দুটো। জাতীয় দলের হয়ে যারা একাধিক সংস্করণে খেলেন, তারা জাতীয় লিগে খেলেন না। তাই দুটো টেস্ট সিরিজের মধ্যে অনেকেরই লাল বলে খেলার অনভ্যাসটা থাকে অনেক দিনের।

অনেক সীমাবদ্ধতার পরও বাংলাদেশের প্রাপ্তি নেহায়েত কম নয়। নিউজিল্যান্ডকে মাউন্ট মঙ্গানুইতে হারিয়ে দেওয়াটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের বড় অর্জন, পাকিস্তানে গিয়ে টেস্ট সিরিজ জিতে আসাটাও অনন্য। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকেও হারিয়েছে বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসান টেস্টের শীর্ষ অলরাউন্ডারের আসন ধরে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন, এখনো দুই নম্বর জায়গাটাতে আছেন সাকিব আল হাসান। পেস বোলিং, অলরাউন্ডার...এমন অনেক জায়গাতেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ছিটেফোঁটা সাফল্য থাকলেও বড় ঘাটতির জায়গা ব্যাটিং। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্য ২৫ বছরে বাড়েনি খুব একটা, যেখানে অন্যান্য দেশের ব্যাটসম্যানরা টেস্ট ব্যাটিংকে দিয়েছেন নতুন দিশা। এখনো বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি ভঙ্গুর, রান করতে মিডল অর্ডার আর লোয়ার মিডল অর্ডারই ভরসা। এর জন্য অনেকেই মিরপুরের উইকেটকে দায়ী করেন, তবে সমানভাবে দায়ী বড় দৈর্ঘ্যরে ক্রিকেট না খেলা এবং মানহীন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে পাটা উইকেটে খেলে রান করার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। এখনো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির সংখ্যা ১৩, যেটা মুমিনুল হক করেছেন ৭৩ টেস্টে। ৯৮তম টেস্ট খেলছেন মুশফিকুর রহিম, তারও টেস্ট সেঞ্চুরির সংখ্যা ১২। এই জায়গাতে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে, যেটা অনেক অনেক ব্যাটিং কোচ কিংবা পরামর্শকরা গত সিকি শতাব্দীতে দূর করতে পারেননি।

বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়াতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে খুব সম্ভবত কেনিয়ার। একটা সময়ে কাছাকাছি শক্তির দল ছিল কেনিয়া ও বাংলাদেশ, ২০০৩ বিশ্বকাপে তো তারা সেমিফাইনালও খেলেছিল। কিন্তু এখন তারা হারিয়েই গেছে ক্রিকেট মানচিত্র থেকে। বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়াতে আর্থিক দিক দিয়ে খানিকটা লাভবান হয়েছে, তাতেই ফুটবলকে টপকে ক্রিকেট হয়ে গেছে দেশের জনপ্রিয়তম খেলা। আর টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তিতে নিঃসন্দেহে ক্রিকেটারদের চেয়ে লাভবান হয়েছেন ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা। একটা সময় বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় মোমবাতির আলোয় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বিসিবি অফিসের বিদ্যুতের লাইনই কেটে দিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ, তাদের কোষাগারে আজ হাজার কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের বিলাসী আয়োজন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের মানচিত্র থেকে কেনিয়ার মতো হারিয়ে গেলে এসব আসত কোথা থেকে?