আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, গত ২৪ জুন তারা এ প্রতিবেদন গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যায় ৩০ জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রসিকিউটররা আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী রবিবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হবে।

এদিকে আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে গতকাল বেরোবির শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তদন্ত সংস্থা মামলার বাদী, সাক্ষী ও বেরোবির ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগ করেনি এবং সংগৃহীত তথ্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

গত ১৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিল। ওইদিন মামলার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে ১৮ জুন এবং বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী আকাশকে ১৯ জুন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সময় বেরোবির সামনে পার্ক মোড়ে আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার মৃত্যু সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হন। এ ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করে, যার ফলে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

গতকাল প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন ২৪ জুন আমরা পেয়েছি। ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন, অন্যান্য নথি এবং জুলাই আন্দোলনের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে আমরা আশা করছি আগামী রবিবার ফরমাল চার্জ দাখিল করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা এটি পর্যালোচনা করে দেখব, যাতে আসামির সংখ্যা বাড়তে বা কমতে পারে। ফরমাল চার্জে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে।’ তিনি জানান, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আবু সাঈদ হত্যায় উসকানি ও নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের তদন্ত ও অভিযোগ পর্যালোচনায় কোনো লুকোচুরি নেই। তদন্ত সংস্থা আমাদের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আমরা সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করি।’

শিক্ষার্থীদের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান : ১১ মাস পর আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন বেরোবির শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া চত্বরে সমাবেশ করে তদন্ত প্রতিবেদন ও সম্ভাব্য চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং পুনরায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান। পরে তারা মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন এবং ভবনের উত্তর গেটে বিক্ষোভ ও দক্ষিণ গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার জন্য বসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আসেনি। তারা দাবি করছে, হামলা নাকি ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিচারহীনতার প্রমাণ।’ তারা আবু সাঈদ হত্যার সঠিক বিচারের দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ করে এভাবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো, অথচ আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। আমরা এই প্রতিবেদনের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করছি।’ অন্য শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মাহিদ শাকিল বলেন, ‘২৩ জুন তদন্ত সংস্থার সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ ও আলোচনার জন্য মিটিংয়ের কথা ছিল, কিন্তু তারা আসেনি। ২২ জুন রাতে আমরা যোগাযোগ করলে তারা সময় জানিয়ে দেবে বলেছিল, কিন্তু না এসেই দুদিন পর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রসিকিউটর এসএম মঈনুল করিম আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন যে, ২৩ জুন আলোচনা হবে, তবু তারা আসেননি।’

মামলার বাদী আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফোন দিলেও তদন্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ হয় না, এটা খুবই দুঃখজনক। আমার সঙ্গে যোগাযোগ না হলে কার সঙ্গে হবে? আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম আসতে চেয়েছিলেন, এমনকি ঈদের পরেও আসার কথা ছিল, কিন্তু তারা আসেননি।’