দুই জাহাজ কিনে ১৫০ কোটি টাকা লাভের স্বপ্নে বিএসসি

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ৯০০ কোটি টাকায় দুই জাহাজ কিনে বছরে ২০০ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছে। আয়কৃত এই টাকার মধ্যে নিট লাভ থাকতে পারে প্রায় ১৫০ কোটি। বিশ^ জুড়ে নৌ-বাণিজ্যে জাহাজ পরিচালনায় আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। দেরিতে হলেও ধীরলয়ে সমুদ্র বাণিজ্যে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে এখন ১০২টিতে উন্নীত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে জাহাজ থেকে আয়ের অপার সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ যত বাড়বে দেশের নাবিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বৃদ্ধি পাবে। নাবিকদের বেতনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। আবার এসব জাহাজ অন্যান্য দেশের পণ্য পরিবহন করেও ভাড়াবাবদ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রয়েছে।’

তবে জাহাজ পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসি দেশীয় পণ্য পরিবহনের চেয়ে ভিন্ন দেশের পণ্য পরিবহনে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে আসছে। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) জাহাজ ভাড়ার মাধ্যমে ২৮৯ কোটি ৫০ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করেছে। বিএসসির মালিকানাধীন ‘বাংলার অগ্রগতি’, ‘বাংলার অগ্রযাত্রা’, ‘বাংলার অগ্রদূত’ বর্তমানে লোহিত সাগর এলাকায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে বাল্কপণ্য পরিবহনের দুই জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ তুরস্কে ও ‘বাংলার অর্জন’ ব্রাজিলে অবস্থান করছে। বিদেশের এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে পণ্য পরিবহনে বিএসসির জাহাজগুলোর চলাচল উল্লেখ করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জাহাজগুলোর প্রধানতম আয় বিদেশি পণ্য পরিবহন করে। যেহেতু বর্তমানে সমুদ্র বাণিজ্যে আয়ের সুযোগ বাড়ছে, তাই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে আরও দুটি বাল্ক জাহাজ কিনছি। ইতিমধ্যে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে এবং আগামী ১৬ জুলাই দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে। এগুলোর মধ্য থেকে আমরা সঠিক প্রতিষ্ঠানটি চূড়ান্ত করব।’

দুটি জাহাজ কিনতে কী পরিমাণ অর্থ খরচ হতে পারে এবং সেগুলো থেকে আয় কত হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার ১৯৯ মিটার দীর্ঘ, ৩৩ মিটার প্রস্থ ও ১৮ মিটার ড্রাফটের দুটি জাহাজ কিনতে প্রাথমিকভাবে আমরা ৯০০ কোটি টাকা বাজেট ধারণা করেছি। দরপত্রে হয়তো এর চেয়ে কম দামেও পেতে পারি। আর এ দুই জাহাজ থেকে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয় এবং খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা থাকতে পারে বিএসসির।

আগে যেখানে পাঁচটি জাহাজ থেকে গড়ে ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছেন বছরে, সেখানে এবার দুই জাহাজ থেকে ২০০ কোটি টাকা কীভাবে আয় করবেন এ প্রশ্নের জবাবে কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘বিদ্যমান জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা ২৭ হাজার টন। আর এখন যেগুলো কিনতে যাচ্ছি সেগুলোর ৬৬ হাজার টনের। প্রায় দ্বিগুণের বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ থেকে আয়ও বেশি আসবে এটাই স্বাভাবিক।’

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিএসসির বহরে একসময় ৪৪টি জাহাজ ছিল। কিন্তু নানামুখী অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনায় বিএসসি লোকসান দিতে দিতে একেবারে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। একপর্যায়ে ২০১৮ সালে এসে সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসে। পরে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনটি এবং ২০১৯ সালে তিনটি মিলে ছয়টি জাহাজ নিয়ে বিএসসির বহর উন্নীত হয় আটটি জাহাজে। ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে বিএসসির বহর আবার সাতটি জাহাজে নেমে আসে। গত বছর অক্টোবরে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৭ বছরের পুরনো এমটি বাংলার সৌরভ ও এমটি বাংলার জ্যোতি জাহাজ দুটি অগ্নিকা-ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে পরবর্তী সময়ে ৫৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হলে বিএসসিতে জাহাজের বহর নেমে আসে মাত্র পাঁচটিতে।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অনুযায়ী, যেকোনো দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ দেশীয় ক্যারিয়ার, ৪০ শতাংশ বিদেশি ক্যারিয়ার এবং বাকি ২০ শতাংশ দেশি ও বিদেশি ক্যারিয়ার যৌথভাবে পরিচালনা করে। বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০২টি জাহাজ দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র ১১ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। বিশ^ নৌ-বাণিজ্যে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ বাড়লে বৈদেশিক আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে বলে জানান নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রচুর নাবিক পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছে। তাদের কর্মক্ষেত্রের জন্য জাহাজ প্রয়োজন। আর দেশীয় জাহাজে কর্মক্ষেত্রের রয়েছে অমিত সুযোগ। তাই দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ যত বাড়বে ভাড়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি আমাদের কর্মসংস্থানও বাড়বে।’

বাংলাদেশ সমুদ্র বাণিজ্য অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, সমুদ্রগামী জাহাজের ক্ষেত্রে বিএসসির ৭টি, কেএসআরএমের ২৬টি, মেঘনা গ্রুপের ২৪টি, আকিজ গ্রুপের ১০টি, এইচআর শিপিংয়ের ৮টি, বসুন্ধরা গ্রুপের ৬টি, ভ্যানগার্ড গ্রুপের ৭টি, ক্রাউন গ্রুপের ৩টি, ডরিয়া, হানিফ ও পিএনএন প্রত্যেকের ২টি করে, সানশাইন, পিএইচ, টিকে, ডরিয়েন ও এমজেএল প্রত্যেকের ১টি করে জাহাজ রয়েছে।