বেসরকারি খাতে বাড়তি ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা

২০২৫ সালে ঋণের সুদ হার গড়ে ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কারণে বেসরকারি খাতকে ১ দশমিক ৩৯ ট্রিলিয়ন টাকা অতিরিক্ত সুদ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে বলে ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের তথ্যে বলা হয়েছে। এই প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে শিল্প খাতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে, বিনিয়োগ কমছে, যে কারণে বেসরকারি খাত ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ : ঋণ গ্রহীতার প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (মুদ্রানীতি বিভাগ) ড. মো. ইজাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। 

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও পরিচালক আশরাফ আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে টাকার অবমূল্যায়ন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে অপ্রতুল ঋণ প্রবাহ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কেবলমাত্র অদক্ষতার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত দরে জ¦ালানি ক্রয় করতে হচ্ছে এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের এর জন্য উচ্চ মূল্য প্রদান করতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের অভাবে শিল্পের উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমেছে, যদিও জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পণ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব।

ব্যাংক খাত নিয়ে এ উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশের ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ, অন্যদিকে ভালো ব্যাংক হিসেবে অবশিষ্ট ৪৭টি ব্যাংকে যার পরিমাণ মাত্র ৫-৭ শতাংশ। তাই এই সমস্যা কেবলমাত্র আর্থিক খাতের ওপর দেওয়া ঠিক হবে না। বেসরকারি খাতের উত্তরণের জন্য ঋণের পুনঃতফসিল ও পুনঃগঠনের সুযোগ থাকা দরকার। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতে ব্যাংক প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

আশরাফ আহমেদ বলেন, ২০২২-২৫ সময়কালে কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বর্তমানে প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ আমদানি সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে।           

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আর্থিক খাতের ঋণ দাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের অবশ্যই আনুষ্ঠানিক খাতকে রক্ষা করতে হবে, তা না হলে অনানুষ্ঠানিক খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

তিনি আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতির সমন্বয় ও নীতির অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতেও ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলো চাইলেই সুদের হার কিছুটা হলেও কমাতে পারে, যার ফলে ঋণ গ্রহীতারা বিশেষ করে এসএমই উদ্যোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।  

 বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, বিগত সময়ে আমাদের আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ কিছু পরিবারের মধ্যে কুক্ষিতগত করা হয়েছিল, যার ফলে এ খাতে অস্বচ্ছতা ও অস্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। জুলাই-আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ও মুদ্রা বিনিময় হার বাজার ভিত্তিক করার পর উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে, এর সুফল দেশের বেসরকারি খাত দেখতে পাবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, চলতি বছরের মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ লাখ কোটি টাকা, এটি মোট অনাদায়ী ঋণের ২৪ শতাংশের বেশি। এ অবস্থা আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন, পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, সরকারের দুর্বল নীতির কারণে খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের হারও বেশ স্লথ। প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম থাকায় এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।