কৃষক সাজিয়ে ব্যাংক হিসাব জমা হচ্ছে লাখ টাকা

শেরপুরে কৃষক সাজিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। হিসাব খোলার পর সেখানে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা জমা হয়। কিন্তু হিসাবধারী জানেন না এই টাকা কোথা থেকে আসে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার শেরপুর অগ্রণী ব্যাংকে বানানো কৃষক ও গুদাম সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বাগ্বিতন্ডা শুরু হলে পুলিশ দুজনকে আটক করে। দিনভর নানা সমালোচনা ও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আটক ওই দুই যুবক ফুজাইল ও মুসা গুদাম সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য।

জানা গেছে, শেরপুর সদর উপজেলার খাদ্যগুদামে দুই হাজার টন ধান সংগ্রহ অভিযানে চলছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রান্তিক কৃষকরা খাদ্যগুদামে ধান দিতে পারবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোরো ধান সংগ্রহের আগে খাদ্য বিভাগের অ্যাপসে অনেক কৃষক আবেদন করে লটারিতে বিজয়ী হন। কিন্তু তারা ধান দেননি। খোলাবাজারে ধানের দাম বেড়ে যাওয়া এবং কঠিন শর্ত মেনে ধান দেওয়া জটিল বলে খাদ্যগুদামে ধান দিতে কৃষকের তেমন আগ্রহ নেই। বোরো ধান সংগ্রহে ভাটা পড়লে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় লটারিতে বিজয়ী বা যে কোনো কৃষক জাতীয় পরিচয়পত্র ও কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র দিয়ে ধান দিতে পারবেন। এই সুযোগে খাদ্য গুদামের সিন্ডিকেটটি বোরো ধান সংগ্রহে ভুয়া কৃষক দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে তারা নিজেরাই গুদামে ধান সরবরাহ শুরু করে।

সূত্র জানায়, সিন্ডিকেটটি ৭ দিনে একই মহল্লা কসবানামা পাড়ার ৪০০ লোক দিয়ে চারটি ব্যাংকে ৪০০ হিসাব খোলেন। ধান সরবরাহের বিনিময়ে গত মঙ্গলবার থেকে অন্তত ৮০টি অ্যাকাউন্টে খাদ্যগুদাম থেকে ১ লাখ ৮ হাজার করে টাকা জমা হয়। গত বুধবার কয়েকটি ব্যাংক হিসাব থেকে অন্তত ৪০ জন ওই পরিমাণ টাকা তুলে নেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী।

বিশ^স্ত সূত্র জানায়, টাকা তোলার সঙ্গে সঙ্গে সিন্ডিকেটের সদস্যরা হিসাবধারী প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা দিয়ে বাকি টাকা নিয়ে নেন। গত বৃহস্পতিবার একই প্রক্রিয়ায় টাকা তুলে ওই দুই যুবক টাকা নিয়ে নিতে চাইলে ঘটে বিপত্তি। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাংকের ভেতরে গন্ডগোল শুরু হলে পুলিশ, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ এসে পড়ে।

হিসাবধারীদের দাবি, তারা জানেই না কেন তাদের নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সার-বীজ কেনার জন্য সরকার টাকা দিচ্ছে বলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা জানিয়েছিল। কিন্তু তাতে লাখ টাকা দেওয়ার কথা নয়। কেউ কেউ মনে করেছিল, ব্যাংক থেকে ঋণ করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। ঋণ আতঙ্ক থাকায় সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে তারা টাকা দিতে চাননি। এ নিয়ে পুলিশ, গুদাম সিন্ডিকেটের দুজন এবং ভুক্তভোগী কয়েকজন মহিলা হিসাবধারীকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

শেরপুর সদর উপজেলার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল করিম ও সদর থানার ওসি জুবায়েদুল ইসলাম ব্যাংক ও গুদামে গিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ব্যাংকে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে পরিষ্কার হয়েছে ফুজাইল ও মুসা ছাড়াও গুদামের একটি বড় সিন্ডিকেট ভুয়া কৃষক বানিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে লভ্যাংশ হাতিয়ে নিচ্ছে। তবে বিষয়টি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য গুদাম থেকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কসবানামা পাড়ার ব্যাংক হিসাবধারী শিল্পী আক্তার বলেন, ‘আমাদের এলাকার খাদ্য গুদাম ব্যবসায়ী আনসার হাজির ছেলে ময়না এলাকা থেকে অনেকের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে দিয়েছেন। বলেছেন, সরকার থেকে সার-বীজের টাকা দেবে। আমরা প্রকৃত কৃষক নই। ব্যাংকে হিসাব খোলার দুদিন পরে জানতে পারি, আমাদের সবার অ্যাকাউন্টে এক লাখ আট হাজার টাকা জমা হয়েছে। এটা কীসের টাকা তা আমরা জানি না।’

শেরপুর খাদ্য গুদামের এসএমও সোহেল রানা বলেন, ‘নিয়ম মেনেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোন সিন্ডিকেট কী করছে তা জানা নাই। কৃষক ছাড়া কাউকে টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই।’

শেরপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘এক এলাকায় এত সংখ্যক কৃষকের নামে ব্যাংক হিসাব হয়ে থাকলে বিষয়টি সন্দেহজনক। ওরা কৃষক কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শেরপুর সদর থানার ওসি জুবায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযুক্ত দুই যুবক ফুজাইল ও মুসার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকারী পাওয়া যায়নি। তাই জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’