নিভৃতে ড. ইউনূসের জন্মদিন তারেক রহমানের শুভেচ্ছা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গতকাল শনিবার ছিল ৮৫তম জন্মদিন। তবে তার এই জন্মদিন উপলক্ষে ছিল না   কোনো আনুষ্ঠানিকতা। অনেকটাই নীরবেই চলে গেল বাংলাদেশের সরকারপ্রধান এই নোবেল বিজয়ীর জন্মদিনটি। জন্মদিনে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

১৯৪০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বথুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. ইউনূস। দেড় দশক ধরে তার জন্মদিনকে বৈশ্বিকভাবে পালন করা হয় সামাজিক ব্যবসা দিবস হিসেবে।

এদিকে তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় ‘জন্মদিনের কেক ও ফুলের তোড়া’ প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনায়’ পৌঁছে দেন। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান সেলিম তা গ্রহণ করেন। প্রধান উপদেষ্টা তাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বাসসকে জানিয়েছেন, ড. ইউনূসের জন্মদিন উপলক্ষে সরকারি কোনো কর্মসূচি নেই। সরকারি পর্যায়ে জন্মদিন পালন করা হবে না। গত শুক্রবার ঢাকার সাভারের জিরাবো সামাজিক কনভেনশন সেন্টারে দুদিনের ‘সোশ্যাল বিজনেস ডে’র উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. ইউনূস। তবে অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার জন্মদিনের উদযাপন-সংক্রান্ত কোনো আয়োজন ছিল না।

অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী। দারিদ্র্য দূরীকরণে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাংকিং তাকে দুনিয়া জুড়ে খ্যাতি এনে দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকও নোবেল জয়ী।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানো হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত) তির্যক সমালোচনা এবং মামলায় জর্জরিত ছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। তাকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছয় মাসের কারাদ- দেয় ঢাকার শ্রম আদালত।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের অনুরোধে ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ইউনূস। ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা, বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজ করছে তার সরকার। সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনসহ নানা খাতে সংস্কারের চেষ্টা করছে।

অধ্যাপক ইউনূসের পিতা দুলা মিঞা সওদাগর ও মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। তার সহধর্মিণী অধ্যাপক ড. আফরোজী ইউনূস। ড. ইউনূসের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূস পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের কলিজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩৯ হাজার ছাত্রের মধ্যে ১৬তম স্থান লাভ করেন। উচ্চ মাধ্যমিকে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করার পর ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ড. ইউনূস।

অধ্যাপক ইউনূস ১৯৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য ফুলব্রাইট স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯৭১ সালে ভান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম ইন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মার্সিসবোরোতে মিডিল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করেন এবং অন্যান্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সমর্থন সংগ্রহ করতে ‘বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার’ পরিচালনা করেন।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের সময় ড. ইউনূস দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। সেই সময় তিনি গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রকল্প চালু করেন। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প চালু হয়। ১৯৮৩ সালে এই প্রকল্পটি ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামে এর কার্যক্রম বিস্তৃত। বাংলাদেশের বাইরেও আমেরিকাসহ গ্রামীণ ব্যাংক পদ্ধতি (রেপ্লিকেট) বিশ্বের ৪৪টি দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান। ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশি ও বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস।

গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুদ্র ঋণ ও ক্ষুদ্রবিত্ত ধারণার প্রেরণার জন্য ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন ড. ইউনূস। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ২০১০ সালে কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেলসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। প্রধান উপদেষ্টার ছবি শেয়ার করে ওই পোস্টে প্রেস সচিব লেখেন, ‘শুভ জন্মদিন, স্যার। আপনার সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার জীবনের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’