রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় মহাসমাবেশ। বৈরী আবহাওয়া ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের ঢল নামে উদ্যানে। মহাসমাবেশে দলটি জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে ১৬ দফা ঘোষণা করে।
দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সমাবেশে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে থাকা দাবিগুলো হলো- সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন, ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্তকরণ, মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে জনপ্রশাসন পুনর্গঠন, পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা, চাঁদাবাজি ও খুন-সন্ত্রাস দমনে প্রশাসনের সক্রিয়তা, ভারতের সঙ্গে চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ ও দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন, দুর্নীতিবাজ ও ঋণখেলাপিদের অযোগ্য ঘোষণা, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও হয়রানি বন্ধ, সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেমিক ইসলামী শক্তির ঐক্য, ইসলামী আদর্শে শান্তি ও উন্নয়ন, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন নিশ্চিতকরণ।
সংস্কার, বিচার ও পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে আয়োজিত ইসলামী আন্দোলনের এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন দলটির আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে চরমোনাই পীর বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা চায়। যে দল যত ভোট পাবে, সংসদে তাদের তত আসন থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘এটি জেনজি প্রজন্মসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের যৌক্তিক দাবি। প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালের সংবিধানেই স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছে। এই সংবিধান সংস্কার করে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হবে। ’২৪ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিচার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।’
চরমোনাই পীর বলেন, ‘বারবার রক্ত দিয়েছি, কিন্তু সফলতা পাইনি, কারণ ভুল নেতা ও নীতির হাতে দেশ তুলে দিয়েছি। এবার ইসলামপন্থিদের ঐক্যের সময় এসেছে। এক বাক্সে ভোট নিলে ইসলামপন্থিরাই হবে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল এই অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা নিঃস্বার্থভাবে এই সরকারের পাশে আছি। তবে সরকার যেন সংস্কার ও নিরপেক্ষতার পথ থেকে বিচ্যুত না হয়।’ কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সব শ্রেণিপেশার মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ। নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক অঙ্গীকার।’
ফিলিস্তিন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বাইতুল মুকাদ্দাসের মুক্তির জন্য।’ তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।
উলামায়ে কেরামের মর্যাদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পেলে উলামায়ে কেরামের মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করব।’
মহাসমাবেশে সংহতি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সব ইসলামী দল, ব্যক্তিত্বের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও আজকে যে ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীমের নেতৃত্বে যারা একমঞ্চে বসে আছেন, তারাই নতুন এই ঐক্যের কা-ারি। এই নতুন ইতিহাস সৃষ্টিতে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান আপনি। একইসঙ্গে সিইসিকে বলতে চাই। পিআর পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। আপনারা সোজা থাকবেন। এরইমধ্যে পক্ষপাতিত্বের কিছু আলামত দেখতে পেয়েছি। আপনাদের কাছ থেকে কোনো পক্ষপাতিত্ব চাই না। কোনো একটি দলের সঙ্গে আলোচনায় নিরপেক্ষতা ভঙ্গ হয়েছে। একটি দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন না।’
তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে বসে হাসিনা আবার এদেশকে সেবাদাসে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। অবশ্যই বিচার করতে হবে। সংস্কারে অনেকে ঢিলা দিচ্ছে। তারা বলছেন, ক্ষমতায় গিয়ে সংস্কার করবেন। কীভাবে বুঝলেন আপনারা (বিএনপি) ক্ষমতায় যাবেন? নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ জন্ম হোক আমরা চাই না।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভবিষ্যতে কোনো সরকারই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা যতদিন ঐক্যবদ্ধ থাকব, ততদিন এই বাংলাদেশে আর কোনো হাসিনা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আমার সামনে আজ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশে যে লাখো ছাত্র-জনতার উপস্থিতি, তারাই ছিল আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সহযোদ্ধা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন জুলাই অভ্যুত্থানের ওই স্মৃতিকে নিজেদের বুকে ধারণ করে শহীদের যে আত্মত্যাগ, জুলাই যোদ্ধাদের যে রক্ত দেওয়া, সেগুলোকে আমরা যতক্ষণ ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলব, ততক্ষণ কারও প্রোপাগান্ডা বা বিদেশি এজেন্টের চক্রান্তে আমাদের কিছু আসে যায় না।’
সারজিস স্মরণ করিয়ে দেন যে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের পাঞ্জাবি, পায়জামা, টুপি দেখে টার্গেট কিলিং করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমার মাদ্রাসার অসংখ্য ভাই এই টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। আগামীর বাংলাদেশে কেউ যেন কাউকে ট্যাগিং করে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার না করতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ সারজিস আলম সংস্কার ও বিচারকে তাদের লড়াইয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য পিআর ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘এই যে পিআর, আগামী বাংলাদেশের সংসদে আমরা যদি আসলেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব চাই তাহলে আগামীতে এই পিআর নিয়ে আমাদের আরও জোরদার কাজ করতে হবে।’
মহাসমাবেশে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, বৌদ্ধ নেতা দয়াল বড়ুয়া, খ্রিস্টান নেতা নির্মল রোজারিওসহ কয়েকটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের নেতারা।
এর আগে সকালে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। মহাসমাবেশের প্রথম পর্বে বক্তব্য রাখেন জেলা ও মহানগরের নেতারা। পরে দুপুরে মূলপর্বে শীর্ষনেতারা দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত নেতাকর্মীদের অনেকেই জানান, তারা ভোরে বাসে, লঞ্চে কিংবা ট্রেনে করে সমাবেশস্থলে পৌঁছেছেন। প্রবল বৃষ্টি, গরম বা ক্লান্তি কোনো কিছুই তাদের অংশগ্রহণে বাধা হতে পারেনি। সরেজমিনে দেখা যায়, কাকরাইল সার্কেল, কাকরাইল মসজিদ, মৎস্য ভবন মোড় থেকে শাহবাগ, মৎস্য ভবন মোড় থেকে কদম ফোয়ারা, শিক্ষা ভবন মোড়, দোয়েল চত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মন্দির গেট, টিএসসি ও শাহবাগ, উদ্যানের ভেতর নেতাকর্মীরা সমাবেশ সফল করতে অবস্থান করছেন।