বিএনপিকে চাপে রাখতে প্রেশার গ্রুপ তৈরির চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টায় জামায়াতকে আড়ালে রাখা হয়েছে। নির্বাচন শেষে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, নির্দিষ্ট আসনে ছাড় পাওয়াসহ একাধিক এজেন্ডা সামনে রেখে প্রেশার গ্রুপ তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সবার আগে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করে প্রেশার গ্রুপ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা ও সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলে, গত শনিবার ঢাকায় ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশ প্রেশার গ্রুপ তৈরির এ আভাস দেওয়া হয়েছে। সমাবেশ সফল করতে জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো জনবল সরবরাহ করেছে।
সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ ও দূরত্ব রয়েছে। তা সত্ত্বেও কয়েকটি লক্ষ্য স্থির করে প্রেশার গ্রুপ তৈরি করে মতবিরোধ ও দূরত্ব কমাতে চান ধর্মভিত্তিক দলের সামনের সারির নেতারা। সূত্র আরও জানায়, ইসলামী আন্দোলনের ঢাকার মহাসমাবেশে ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলও উপস্থিত ছিলেন ওই মহাসমাবেশে।
সূত্রমতে, যেহেতু পর্দার অন্তরালে জামায়াত প্রেশার গ্রুপ সংগঠিত করার কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাই কৌশলগত কারণে ফ্রন্টলাইনে এখনো আসতে চাইছে না জামায়াত। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ছাড়াও এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদসহ ডান-বামঘেঁষা দলের অনেক নেতা ওই সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিয়েছেন। মহাসমাবেশে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে তলেতলে প্রেশার গ্রুপ তৈরির প্রাথমিক ঐক্য হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো চেষ্টা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। নির্বাচন বিলম্বিত করতে যে ঐক্যের চেষ্টা চলছে, জনদাবির কাছে তা বানের জলের মতো ভেসে যাবে।’ এ প্রসঙ্গে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন যেমন জরুরি, তেমনি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করাও ভীষণ জরুরি। আমরা নির্বাচনও চাই, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিনির্মাণে সংস্কারও চাই।’ তিনি বলেন, ‘একটি স্থায়ী কাঠামোর বিনির্মাণে নির্বাচন কিছুটা পেছালেও জনগণ আপত্তি তুলবে না। নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গুরুত্বহীন করে তুললে সংকট থেকেই যাবে।’
ভোট হলেই ক্ষমতায় আসবে বিএনপি, এ রকমই ধারণা সবার। বিএনপির ভেতরেও একই ধারণা। বিএনপি চায় দ্রুত নির্বাচন। অন্যরা বিএনপির কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। সরকার চায় বিএনপিকে ম্যানেজ করে ক্ষমতা কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী করতে। এ বিবেচনা থেকেই প্রেশার গ্রুপ খুব জরুরি মনে করছে সরকার, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল।
বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র মনে করে, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে বিএনপির মতো শক্তিশালী সংগঠন দ্বিতীয়টি নেই। দলটিকে সমীহ করে অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেওয়ার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলে কিছুটা দূরত্ব দেখা দিয়েছে। এ দূরত্ব কমাতে বিএনপিও সচেষ্ট। অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্য দলও তা চায়। বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রেশার গ্রুপের প্রয়োজনীয়তা দেখছে তারা। নির্বাচন আদায় করে নেওয়ার প্রশ্নে এসব বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করছে বিএনপি, বিভিন্ন দলের চাওয়া-পাওয়ার দাবিগুলোয় সায় দিয়ে যাচ্ছে তারা।
প্রায় ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি দ্রুত নির্বাচন আদায় করে নিতে চায়, অবশ্য সব দল ও সরকারের সঙ্গে সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক রেখে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিএনপি জোরালো অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন প্রশ্নে দেশের জনগণ তাদের সঙ্গে রয়েছে ধরে নিয়ে অন্যদের প্রেশার গ্রুপ তৈরির তথ্য পেয়েও আমলে নিচ্ছে না বিএনপি।
জানা গেছে, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে তেমন আগ্রহ নেই। তাদের বেশি আগ্রহ সংস্কার নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারও সংস্কারকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, প্রেশার গ্রুপ তৈরি হলে তাদের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই; তাতে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা সম্ভব হবে। নির্বাচনকে সেকেন্ড প্রায়োরিটি রেখেছে জামায়াত-এনসিপিও। বিএনপির নির্বাচনের চাপ মোকাবিলায় প্রেশার গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এনসিপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এক কাতারে নেওয়ার পরিকল্পনা সফল ও সার্থক হলে অন্য সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপিকে টেক্কা দেওয়ার রাজনীতি শুরু করবে জামায়াত। বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রিক নানা ইস্যুতেও দর-কষাকষিতে জড়াবে এ প্রেশার গ্রুপ। তখন সরকার কিছুটা স্বস্তিতে দেশ পরিচালনা করতে পারবে।
এনসিপির চিন্তায় দ্বিতীয় বিবেচনা নির্বাচন, এটি স্পষ্ট দলটির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ বক্তব্যে। তিনি গতকাল রবিবার বলেছেন, ‘আপনারা যেভাবে টাইমলাইন করে ভোটের দাবি জানাচ্ছেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন চাচ্ছেন, ঠিক সেভাবে টাইমলাইন করে ভোটের দাবির সঙ্গে বিচার ও সংস্কারের দাবিও করুন।’