কুমিল্লার মুরাদনগরে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী নারীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন থেকে ভুক্তভোগীর ভিডিও ও ছবি আদেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরাতে বাংলাদেশ টেলি যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ ছাড়া ওই ঘটনায় করা মামলার তদন্তের অগ্রগতি আগামী ১৪ জুলাই হাইকোর্টকে জানাতে বলা হয়েছে।
এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল রবিবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এসব আদেশ দেয়। মুরাদনগরে বসতঘরের দরজা ভেঙে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন গতকাল বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মীর এ কে এম নূরুন্নবী হাইকোর্টে এ রিট আবেদনটি করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে তিনি শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান ও তানিম খান।
এদিকে এ ঘটনায় মূল আসামি ফজর আলীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে ফজর আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অ্যাডভোকেট মীর এ কে এম নূরন্নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি সবার বিবেককেই নাড়া দিয়েছে। ওই নারীকে নির্যাতনের বিচার ও প্রতিকার অবশ্যই হওয়া উচিৎ। এজন্য হাইকোর্টে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলাম। আদালত তখন রিট আবেদন নিয়ে আসতে বলেন। আমাদের বক্তব্য শুনে আদালত ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরানো এবং তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়েছে। আইনজীবী আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভুক্তভোগী নারীর ভিডিও ছবি কেন সরানোর নির্দেশ দেওয়া হবে না, তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লার মুরাদনগরের একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে সংখ্যালঘু এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় গত শুক্রবার মুরাদনগর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী। তিনি অভিযোগ করেন, ১৫ দিন আগে স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে আসেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ফজর আলী (৩৮) নামে এক ব্যক্তি ঘরের দরজা খুলতে বললে তিনি দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
মুরাদনগরের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ : কুমিল্লার মুরাদনগরে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক নারীকে তার বাবার বাড়িতে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি ফজর আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি একই উপজেলার বাহেরচর গ্রামের সহিদ মিয়ার ছেলে। এর আগে শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে এ ঘটনার জেরে আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল সকালে এসব তথ্য জানান কুমিল্লা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন। ফজর আলী ছাড়া গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন একই এলাকার আবদুল হান্নানের ছেলে সুমন, জাফর আলীর ছেলে রমজান, মো. আলমের ছেলে মো. আরিফ ও তালেম হোসেনের ছেলে মো. অনিক।
এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ওই নারীর স্বামী পাঁচ বছর ধরে প্রবাসে থাকেন। টাকা ধার নেওয়ার সুবাদে ওই নারীর সঙ্গে ফজর আলীর ঘনিষ্ঠতা হয়। এ বিষয়টি জানতে পেরে ফজর আলীর ছোট ভাই শাহপরানও তার সঙ্গে সম্পর্ক করার চেষ্টা করেন। ঘটনার দিন রাতে বড় ভাই ফজর আলী তার ঘরে প্রবেশ করলে আগ থেকে ওত পেতে থাকা ছোট ভাই শাহপরানও লোকজন নিয়ে তার ঘরে ঢুকে ফজর আলী ও ওই নারীকে আটক করে মারধর করে ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় ওই নারীর চিৎকারে আশপাশের কয়েকজন লোক এসে ভুক্তভোগী নারীকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে পায়।
এক ফাঁকে ফজর আলী পালিয়ে যায়। পরে ঘটনার ধারণকৃত ভিডিওটি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। পরের দিন ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে মুরাদনগর থানায় মামলা দায়ের করেন। নারীকে নির্যাতনের ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার বিষয়ে ওই নারী জানান, ৪-৫ দিন আগে পাওনা টাকার জন্য ফজর আলী তার পিতা মাতাকে চাপ দেয়। খবরটি শোনার পরে তিনি বাবার বাড়িতে আসেন ফজর আলী সঙ্গে কথা বলতে। ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে ফজর আলী ঘরে ঢুকলে আগ থেকে ওত পেতে থাকা তার ছোট ভাই শাহপরান লোকজন নিয়ে ঘরে ঢুকে গালাগাল করতে করতে মারধর করে। এক ফাঁকে কেউ একজন ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মান সম্মান তো চলেই গেছে। আর বিচার দিয়ে কি হবে। আমি শাস্তি চাই।’
এদিকে মামলার আসামি ফজর আলীসহ অন্য আসামিরা বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। গতকাল বিকেলে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে উপজেলা বিএনপি। মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে ফজর আলীকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করলেও তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা ওই নারী পুলিশকে বলেনি। তবে ভিডিও ধারণ ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ায় জড়িতদের শনাক্ত করে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রিমান্ডের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করেছেন। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি ফজর আলীকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর ভিডিও ছড়ানোয় জড়িত চার জনকে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে। আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবাদ ও নিন্দা অব্যাহত : মুরাদনগরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এক নারীকে নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব সংগঠনের নেতারা বলছেন, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান সহিংসতা রোধে সরকারের ভূমিকায় অবহেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে বলেও মনে করছেন তারা। অবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
সংখ্যালঘু নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ঘটনাটি শুধু একটি ভয়াবহ অপরাধ নয়, বরং নারীর প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ এবং বিদ্বেষের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ, যা বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের মৌলিক ভিত্তিকে লঙ্ঘন করে। আসক মনে করে, এই অপরাধের পেছনে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং সরকারের নির্লিপ্ততা ও দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা কাজ করছে। অতীতে নারীদের ওপর হামলা, নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনায় বিচার বিলম্বিত বা অপরাধীদের রক্ষা করার যে প্রবণতা দেখা গেছে এই ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা বলে বিবেচিত হতে পারে।
এ ঘটনার যথাযথ ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযুক্তকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে আসক। একই ঘটনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এক যৌথ বিবৃতিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা বলেন, কুমিল্লার মুরাদনগরে ঘরের দরজা ভেঙে এক হিন্দু নারীকে যেভাবে গণধর্ষণ, নির্যাতন এবং ভিডিও ধারণ করে প্রচার করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। ফজর আলী ও তার সহযোগীসহ সারা দেশে নারী নিপীড়ক ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে নেতারা আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নারীদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে, অনলাইনসহ নানাভাবে নিপীড়ন, হেনস্তা করা হচ্ছে। অব্যাহত নারী নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় কোনো দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। মুরাদনগরের ঘটনায় প্রতিবাদ ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজধানীর পুরানা পল্টনে মশাল মিছিল করেছে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। মিছিল-পরবর্তী সমাবেশ থেকে অবিলম্বে নারী নিপীড়ক ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান বক্তারা।