প্রতিষ্ঠিত মার্কেটিং চ্যানেল, কাঁচামাল হিসেবে নিজস্ব সমবায়ের খামারিদের দুধ থাকার পরও শুধু সক্ষমতার ঘাটতিতে দুধ প্রক্রিয়াকরণ ও পানি উৎপাদনের কয়েকটি কারখানা বছরের পর বছর বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)। যেখানে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্টের পথে। এ অবস্থার উত্তরণে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে আবারও বেসরকারি বিনিয়োগ আহ্বান করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে মিল্ক ভিটা ২০২১ সালেও একই ধরনের বিনিয়োগ চেয়েছিল, বেসরকারি খাতের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী ও বাজারজাতকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত নানা জটিলতায় আর বিনিয়োগে যায়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আবারও বেসরকারি বিনিয়োগ চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিনিয়োগের আগ্রহ পত্র (ইওআই) প্রকাশ করেছে। যাতে যৌথ বিনিয়োগ বা ভাড়া হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দুটি দুধ প্রসেসিং কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চায় মিল্ক ভিটা। চলতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে আগ্রহী বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রস্তাবনা চাওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, মিল্ক ভিটার মিরপুরে অবস্থিত ঢাকা ডেইরি প্ল্যান্ট এবং বাঘাবাড়ী ঘাট ডেইরি প্ল্যান্ট দুটি পরিচালনায় বেসরকারি বিনিয়োগ চাইছে প্রতিষ্ঠানটি। এই দুটি ডেইরিতে ইউএইচটি মিল্কের প্রসেসিং প্ল্যান্ট রয়েছে, যে দুটি প্ল্যান্ট বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে।
মিল্ক ভিটার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইউএসটি মিল্কের প্ল্যান্ট দুটির দৈনিক ২০ হাজার লিটার করে দুধ প্রসেসিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে। মিল্ক ভিটা প্ল্যান্ট দুটিতে উন্নতমানের মেশিনারিজ স্থাপন করেছিল, যেগুলো এখনো ঠিক আছে। তবে মিরপুর ডেইরির ইউএসটি প্ল্যান্টের পিএলসি সফটওয়্যারে সমস্যা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ কারণে এখানে বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এই প্ল্যান্টগুলোয় ফ্লেভারড মিল্কও উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানান কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, মিল্ক ভিটা চায় বিনিয়োগকারীকে লম্বা সময়ের জন্য প্ল্যান্ট দুটি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দিতে। কারখানা পরিচালনার ব্যয় যৌথ হতে পারে আবার বিনিয়োগকারী এককভাবেও বিনিয়োগ করতে পারবে। তবে আলোচনা সাপেক্ষে লভ্যাংশ ভাগাভাগি করবে বিনিয়োগকারী ও মিল্ক ভিটা।
মিল্ক ভিটা বলছে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটির প্রায় রেডি একটি কারখানা ব্যবহারের জন্য পাবে। সঙ্গে মিল্ক ভিটার পুরো মার্কেটিং চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে। পণ্যের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত দুধের সরবরাহও পাওয়া যাবে মিল্ক ভিটার নিজস্ব চ্যানেল থেকেই। আবার ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার হবে মিল্ক ভিটা। বাড়তি ফোকাসের জন্য বিনিয়োগকারী চাইলে নিজের মতো করেও মার্কেটিং চ্যানেল ঠিক করতে পারবে। তবে মিল্ক ভিটা এখানে শুধু দুধের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন হচ্ছে কি না, সেটা দেখবে।
জানা গেছে, দুধ প্রসেসিংয়ের দুটি প্ল্যান্ট ছাড়াও একটি পানির প্ল্যান্টও বেসরকারি খাতে দিতে চায়। এর আগে ২০২১ সালে দুগ্ধ প্রসেসিংয়ের ইউএসটি প্ল্যান্ট, কনডেন্সড মিল্ক, বোতলজাত পানির প্ল্যান্ট, একটি ক্যান তৈরির ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারখানাগুলোর মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করেছিল।
তবে দেশের এই খাতের ব্যবসায়ীরা তখন ব্যাপক আগ্রহ দেখায় এবং মিল্ক ভিটার সঙ্গে মিটিংও করে। জানা যায়, সে সময় খুবই অল্প সময় যেমন দুই-পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করতে চেয়েছিল মিল্ক ভিটা। কিন্তু আগ্রহী ব্যবসায়ীরা চেয়েছিল লম্বা সময়ের জন্য। যাতে অন্তত ১০ বছরের জন্য চুক্তি করা যায়। এই জটিলতাতেই তখন এটা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কিন্তু দীর্ঘদিনের এই বন্ধ কারখানাগুলো এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে মিল্ক ভিটার জন্য। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও পরিচালনার ব্যয় বছরের পর বছর টানতে হচ্ছে। যে কারণে দিনে মিল্ক ভিটারও আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইউএইচটি মিল্কের কারখানাগুলো ২০১৩ সালের পর থেকেই বন্ধ বলে জানা গেছে।
অথচ মিল্ক ভিটার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের আড়ং ডেইরি, প্রাণ, আকিজ, রংপুর ডেইরিসহ সবাই প্রসেস মিল্কের ভালো ব্যবসা করে যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই তাদের ব্যবসা বড় হচ্ছে। কিন্তু মিল্ক ভিটা তাদের সক্ষমতা
থাকলেও মার্কেটে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম, আয় কমে যাওয়া, কারখানা বন্ধ করে রাখাসহ নানা কারণেই বাজারে দখল কমছে মিল্ক ভিটার। কারণ মানসম্মত পণ্য থাকার পরও ঢাকার মুদি দোকানগুলোয় সরবরাহ দুর্বলতায় মিল্ক ভিটার পণ্য পাওয়া মুশকিল।
একই অবস্থা পানির বাজারেও। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে পানির জমজমাট ব্যবসা। প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বোতলজাত পানির ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশে বোতলজাত পানির ব্যবসায় কোকা-কোলা, ইফাদ, পারটেক্স গ্রুপ, ট্রান্সকম, মেঘনা, একমি, প্রাণের মতো বড় কোম্পানিগুলো দেদার ব্যবসা করে যাচ্ছে। অথচ কোটি কোটি টাকা খরচ করে কারখানা করেও বাজারে নেই মিল্ক ভিটার পানি। কারখানাটি পরিচালনা করতে না পারায় বন্ধ রাখতে হয় বছরের পর বছর।
এসব বিষয়ে কথা বলতে মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলামকে ফোন করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
মিল্ক ভিটার বর্তমান ব্যবসা ১৯৭৩ সালে সমবায় ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনে আসে মিল্ক ভিটা। সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ১১টি কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানার মধ্যেও আবার একাধিক পণ্য উৎপাদনের আলাদা আলাদা প্ল্যান্ট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালায় কৃষক সমিতি এবং তত্ত্বাবধান করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।
মিল্ক ভিটা বর্তমানে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুত এবং বাজারজাত করছে। এর মধ্যে দুধ, দই, রসগোল্লা, লাবাং, মাঠা, ফ্লেভারড মিল্ক, মাখন, ঘি, সন্দেশ, রসমালাই, কেক উল্লেখযোগ্য। পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে প্রতিষ্ঠানটি চকোলেট ও আইসক্রিমের কারখানা স্থাপন করেছিল; কিন্তু সেগুলোও বন্ধ করে রাখা হয়েছে পরিচালনার সক্ষমতার অভাবে।