জার্মানির এক হ্রদের পাড়ে প্রাচীনকালের মানুষ নিয়ান্ডারথালরা গড়ে তুলেছিল এক অভিনব চর্বি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। নিউমার্ক-নরড নামে পরিচিত জার্মানির মধ্যাঞ্চলের ওই অঞ্চলে কয়েক বছর ধরে খনন চালিয়ে গবেষকরা পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারটি হাড়ের টুকরো এবং ১৬ হাজারের বেশি চকমকি পাথরের অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ, যেগুলোর বহু অংশে আগুনের চিহ্ন স্পষ্ট। এসবের বিশ্লেষণ থেকেই উঠে আসে প্রাগৈতিহাসিক এই ফ্যাট ফ্যাক্টরির চিত্র। প্রস্তর যুগে তারা সেখানে পশুর হাড় ভেঙে সেগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটিয়ে সেই হাড়ের ভেতরের মূল্যবান চর্বি আলাদা করত, সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমনটাই জানিয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা শিকার করে পশুর হাড় সংগ্রহ করত। এরপর পাথরের হাতুড়ি দিয়ে সেই হাড় ভেঙে মজ্জা ও চর্বিসমৃদ্ধ অংশ ফুটিয়ে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চর্বি আলাদা করত। ফুটন্ত তরলে চর্বি ওপরে উঠে আসার পর তা ঠান্ডা করে সংগ্রহ করা হতো। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং বিশদভাবে পরিচালিত। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওলিথিক প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণার সহলেখক উইল রোয়েব্রোকস বলেন, নিয়ান্ডারথালদের আমরা বহুদিন ধরে আদিম ও বোকা ভেবে এসেছি। তবে তার মতে এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, তারা ছিল চমৎকার সংগঠক, দক্ষ শিকারি এবং ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা।
গত কয়েক দশকে নিয়ান্ডারথালদের সম্পর্কে নানা যুগান্তকারী আবিষ্কার গবেষকদের এই ধারণা থেকেই সরিয়ে এনেছে। আগে জানা গিয়েছিল, তারা সুতা তৈরি করত, গুহার দেয়ালে খোদাই করত, হাড়ে নকশা করত এবং এমনকি ঈগলের নখর দিয়ে অলংকার বানাত। নতুন এই গবেষণা প্রমাণ করছে, শুধু শিল্প বা সৌন্দর্য নয়, পুষ্টি ও খাদ্য সংরক্ষণ নিয়েও তাদের ছিল জটিল ও কার্যকরী কৌশল। গবেষকরা বলছেন, নিয়ান্ডারথালদের এই হাড় ফুটিয়ে চর্বি বের করার পদ্ধতি ছিল শুধু খাবার সংগ্রহ নয়, ভবিষ্যতের জন্য খাবার সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি নিশ্চিত করার একটি কৌশল।
‘প্রোটিন বিষক্রিয়া’ থেকে বাঁচতে হাড় সেদ্ধ শুধু হাড় গরম করে চর্বি আহরণই নয় নিয়ান্ডারথালরা তাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় জটিল পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান প্রয়োগ করত। জার্মানির নিউমার্ক-নরডে খননকাজে পাওয়া নিদর্শন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন, চর্বি আহরণ ছিল তাদের টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যা ‘প্রোটিন পয়জনিং’-এর মতো প্রাণঘাতী পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধে সহায়ক ছিল। গবেষণা অনুযায়ী, মানবদেহের জন্য সীমিত পরিমাণে চর্বি অপরিহার্য, বিশেষ করে শিকারনির্ভর জীবনযাপনকারী নিয়ান্ডারথালদের ক্ষেত্রে। তারা প্রধানত প্রাণিজ উৎসের খাদ্য খেত। কিন্তু চর্বিহীন মাংস দীর্ঘদিন খেলে শরীরে এক ধরনের বিপজ্জনক পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়, যাকে বলা হয় ‘প্রোটিন পয়জনিং’।