ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল ঘাতকরা সব শেষ করে দিয়েছে

ইকরাম বিস্কুটের প্যাকেটটি নিয়ে সড়ক পার হতে যেয়ে প্যাকেটটি ছিঁড়ে একটি বিস্কুট মুখে দেয়। এমন সময় পেছন থেকে মাথায় গুলি করে পুলিশ। মুহূর্তেই ইকরামের মগজ ছিটকে সড়কে পড়ে। এভাবেই বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করছিলেন ছোট ভাই ইমরান হোসেন ফারুক।  নিহত ইকরামের বাবা আনোয়ার হোসেনের প্রশ্ন এ হত্যার দায় কে নেবে? তিনি বলেন, ‘বাবা হয়ে সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার কষ্ট কাউকে বলে বুঝাতে পারব না। ছেলেকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। ঘাতকরা সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল? কেন তাকে গুলি করে হত্যা করা হলো? এতটাই অপরাধ করলে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত তারা। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। নিশ্চয়ই তিনি সঠিক বিচার করবেন।’

নিহত ইকরাম হোসেন কাউছার ফেনীর পরশুরাম উপজেলার রাজসপুর গ্রামের হাজী বাড়ির স্কুলশিক্ষক আনোয়ার হোসেনের ছেলে। তিন সন্তানের মধ্যে ইকরাম ছিল মেজো।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঢাকার কবি নজরুল কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন কাউছার। গত বছরের ১৭ ও ১৮ জুলাই দুদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংযোগ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ম্যাসগুলোতে রান্না বন্ধ ছিল। দুদিন কিছু খেতে না পেরে ইকরাম খাবারের জন্য ১৯ জুলাই দুপুরে ম্যাস থেকে বের হন। জুমার নামাজ শেষে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঠেলাগাড়িচালকে অভুক্ত থাকার কথা জানালে তিনি ইকরামকে তার ম্যাসে নিয়ে ভাত খাওয়ান। পরে ঠেলাগাড়িচালক সেঁধে ইকরামকে রাতের খাবারের জন্য একটি বিস্কুটের প্যাকেট ধরিয়ে দেন। ইকরাম বিস্কুটের প্যাকেটটি নিয়ে সড়ক পার হতে যেয়ে প্যাকেটটি ছিঁড়ে একটি বিস্কুট মুখে দেন। এমন সময় পেছন থেকে মাথায় গুলি করে পুলিশ। মুহূর্তেই মগজ ছিটকে সড়কে লুটিয়ে পড়েন ইকরাম। পরে তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ইমরান হোসেন ফারুক বলেন, মৃত্যুর ২০ মিনিট আগেও বড় ভাই ইকরাম হোসেন কাউছার বাড়িতে ফোন করেছিলেন। কবি নজরুল কলেজসংলগ্ন লক্ষ্মীবাজার এলাকায় ভাই যে জায়গায় থাকতেন সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় তার মোবাইল ফোনে চার্জ ছিল না। যে ঠেলাগাড়িচালক ভাইকে ভাত খাইয়েছিলেন তার ফোন থেকেই বাড়িতে ফোন করেন ইকরাম। সেই ঠেলাগাড়িচালকই ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ প্রথম বাড়িতে জানান।

ইমরান আরও বলেন, ভাইয়া শেষ ফোনে কথা বলেছিলেন বাবার সঙ্গে। বাবাকে সে বলেছিল সে ভালো আছে। তার জন্য দোয়া করতে। আমাকে দেখে রাখতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরে আসবে বলেও জানায়।

নিহত ইকরামের বাবা স্কুলশিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, তার তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে ইকরাম এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে মেধাবী হওয়ায় ঢাকার কবি নজরুল কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে পড়ছিল। জমি বিক্রি করে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছিলেন। ছেলের স্বপ্ন ছিল মাস্টার্স শেষ করে সে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। পুলিশের গুলিতে তার স্বপ্ন শেষ হলো। তিনি প্রশ্ন রাখেন এ হত্যার দায় কে নেবে?

ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে ১৯ জুলাই রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন তার মা-বাবা। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ নিয়ে এলে রাত ৯টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। ইকরামের একমাত্র বোন জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমাদের পরিবার খুবই গরিব। পড়ালেখা শেষ করে ইকরাম পরিবারের হাল ধরবে, আমাদের দুঃখ ঘুচবে এমনই আশা করেছিলাম। এখন আমার ভাই নেই।’