বিএনপিকে ভোট দিতে চায় ৩৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ভোট দিতে চায়। এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আর তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আওয়ামী লীগ। অন্যান্য ইসলামী দলগুলো সম্মিলিতভাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। আর সবচেয়ে নিচের অবস্থানে আছে জাতীয় পার্টি।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছর ২০ থেকে ৩১ মে সময়ে ‘যুব জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়। সারা দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরের ২ হাজার ৩টি খানা এ জরিপে অংশ নেয়। গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এ জরিপের ফল প্রকাশ উপলক্ষে এক গোলটেবিল আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি শীর্ষে থাকবে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, দলটির পক্ষে মত দিয়েছেন ২১ দশমিক ৪৫ শতাংশ তরুণ। এ ছাড়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট এমনটাই মনে করছেন উত্তরদাতারা। জরিপ অনুযায়ী, গত বছর ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে ১৫ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেতে পারে। আর অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট পেতে পারে। জাতীয় পার্টি পাবে ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট হবে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ।

সানেম জানিয়েছে, তাদের এ জরিপ পরিচালিত হয় দেশের সবকটি বিভাগে। প্রতিটি বিভাগ থেকে দুটি জেলা এবং প্রতি জেলা থেকে দুটি উপজেলা বেছে নেওয়া হয়। দুই হাজার তরুণ এ জরিপে অংশ নেন; যাদের বয়সসীমা ১৫ থেকে ৩৫ বছর। অংশগ্রহণকারীদের ৪০ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে, ৬০ শতাংশ এসএসসি বা তার ওপরে শিক্ষিত।

জরিপের লিঙ্গভিত্তিক ফল তুলে ধরে সানেম বলছে, জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। অংশগ্রহণকারী ছেলেদের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিএনপি, ২২ দশমিক ২১ শতাংশ জামায়াত এবং ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। আর মেয়েদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ০৩ শতাংশ বিএনপি, ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ জামায়াত এবং ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ এনসিপির পক্ষে মত দিয়েছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শহর ও গ্রামের সমান প্রতিনিধি ছিল বলে জানিয়েছে সানেম। জরিপের ফল বলছে, জরিপে অংশ নেওয়া গ্রামীণ তরুণদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৭২ শতাংশ বিএনপি, ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ জামায়াত এবং ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এনসিপিকে সমর্থন করেছেন। শহুরে তরুণদের বিএনপি ৩৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ, জামায়াত ২১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং এনসিপি ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রতি এখনো গ্রামীণ তরুণদের ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশের সমর্থন রয়েছে, আর শহুরে তরুণদের ক্ষেত্রে এ হার ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

ভোটের বাইরে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ জরিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে চাকরির বাজার সম্পর্কে তরুণদের উপলব্ধি বেশ গভীর ইঙ্গিত দেয়। তরুণদের শিক্ষা কতটা চাকরির জন্য প্রস্তুত করেছে এমন প্রশ্নে মাত্র ১৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ নিজেদের ভালোভাবে প্রস্তুত মনে করেছে, অন্যদিকে ৩০ দশমিক ৭৮ শতাংশ মনে করে, চাকরির প্রস্তুতিতে তাদের শিক্ষার কোনো অবদানই নেই। ক্যারিয়ার চাহিদার ক্ষেত্রে, ৩৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ সরকারি চাকরিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, আর ২৬ দশমিক ৪১ শতাংশ উদ্যোক্তা হতে চায়। লিঙ্গভিত্তিকভাবে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৭৫ শতাংশ সরকারি চাকরি পছন্দ করে, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

চাকরি খোঁজার সময়কালও হতাশাজনক। ২৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ তরুণ দুই বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি খুঁজছেন আর মাত্র ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ গত এক মাসে খোঁজা শুরু করেছেন। যারা গত এক বছরে অন্তত একটি চাকরির জন্য আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ১২ শতাংশ কখনোই সাক্ষাৎকার কল পাননি। প্রশিক্ষণের দিক থেকে, মাত্র ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ গত এক বছরে কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যার মধ্যে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। খুব কম শতাংশ তরুণের রয়েছে বেসিক ইমেইল লেখা এবং কম্পিউটারে চিঠি ড্রাফট করার যোগ্যতা। আপডেটেড সিভি নেই এদের কারোরই।

আন্তর্জাতিক অভিবাসনও জরিপের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ১ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরে এসেছেন এবং তাদের মধ্যে ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ আবার যেতে আগ্রহী। যারা কখনো বিদেশে যাননি, তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশ যেতে চান আর ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ দেশে থেকেই কিছু করতে চান। যারা দেশে থাকতে চান, তাদের মধ্যে নারীর হার ৭০ দশমিক ৫৭ শতাংশ আর পুরুষের হার ৪৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বিদেশে যাওয়ার প্রধান মোটিভেশন- উচ্চ বেতন, ভালো সুযোগ-সুবিধা আর উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশা।

জরিপের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তরুণদের মতামত মিশ্র ছিল। ৫৩ শতাংশ মনে করেন, সরকার সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সফল হয়েছে, যেখানে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ কোনো অগ্রগতি দেখেননি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও মতভেদ দেখা যায় ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ উন্নতি দেখেছেন, কিন্তু ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বজায় রাখা হয়নি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ৫৬ শতাংশ মনে করেন, এখন মানুষ বেশি স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে, তবে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ একমত নন।

তবে দেশের তরুণদের মধ্যে ৯৩ দশমিক ৯৬ শতাংশই আশাবাদী যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। আর ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ইতিমধ্যেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৭৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ তরুণ, অন্যদিকে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে অনাগ্রহী।