জটিলতা সৃষ্টি হবে বিচারিক ব্যবস্থায়

বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণে ঐকমত্যের কথা জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে কমিশন। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে মত দিয়েছে কিছু রাজনৈতিক দল। বিচারব্যবস্থাকে বিচারকাক্সক্ষীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণেও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দুটি বিষয়েই ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এসব বিষয়ে ইতিমধ্যে আইনজীবীরা সরব হয়েছেন। তারা কোনোভাবেই হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ চান না। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ নিয়ে ৩৬ বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ে বিষয়টি মীমাংসিত হয়েছে। এখন এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ আদালত অবমাননার শামিল হবে। আর উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিলুপ্ত হয়ে গেছে ৩৫ বছর আগে। এখন এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হলে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করেই করতে হবে।

আইনজীবীরা জানান, গত শতকের আটের দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে রাজধানীর বাইরে হাইকোর্টের কয়েকটি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হয়। এরপর ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করে বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর ও সিলেটে ছয়টি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের তৎপরতাকে চ্যালেঞ্জ করে করা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর সংশোধিত ১০০ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দেয়। হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিকেও অবৈধ ঘোষণা করে সর্বোচ্চ আদালত। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে কার্যত বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব সিদ্ধান্ত (হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ) যারা নেন তারা অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়টি পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে বলা আছে যে, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ করা ছিল অবৈধ।’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় চালানো আর বিচার বিভাগ চালানো এক বিষয় নয়। বিচার বিভাগ চালানোর বিষয়ে কিছু বিধান আছে। এজন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আছে।’ তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি অষ্টম সংশোধনীর মামলাটির রায়ের পর রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) হয়নি। তার মানে হচ্ছে তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এখন কিছু করতে হলে আইনি জটিলতা দেখা দেবে।’ উপজেলা পর্যায়ে আদালতের সম্প্রসারণে ঐকমত্যের বিষয়ে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রয়োজনে যা হবে তা সুপ্রিম কোর্টের অভিমত ও সংবিধানের আলোকেই করতে হবে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের সুপারিশটাই উনারা বলছেন। কমিশন যে দুই সুপারিশ করেছে তা স্পষ্টত আদালতের অবমাননা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। সেটা আদালতের অবমাননা নয়। তবে যদি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় সেটা অবশ্যই আদালতের অবমাননা হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু ঐকমত্য কমিশন সরকারের গেজেটে গঠিত হয়েছে সে কারণে কমিশনের এ-বিষয়ক আলোচিত সূচিটার কারণে আদালতের অবমাননা হয়েছে। আমি আশা করব সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা নিশ্চয়ই এটা আমলে নেবেন এবং আদালত অবমাননার প্রসিডিংস শুরু করবেন।’ তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ আইনজীবী এর (হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ) বিরোধিতা করুক বা না করুক, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। এটি যেহেতু বহু আগেই সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, তাই এটিকে এখন সামনে আনা অবান্তর।’

বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের প্রধান, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সুপারিশ দিয়ে দিয়েছি। এখন আর এ বিষয়টিতে আমি নেই। তাই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’ কমিশনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারক মাসদার হোসেন বলেন, ‘আমরা এতটা আনাড়ি নই যে, অষ্টম সংশোধনীর মামলার বিষয়টি আমাদের চিন্তায় থাকবে না। আমরা সংস্কার চেয়েছি। কীভাবে কী করতে হবে সেটি সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধানের আলোকেই নির্ধারিত হবে।’

আইনজীবীদের বিক্ষোভ : সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থানান্তরে ঐকমত্য কমিশনের অভিমতের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করেছেন আইনজীবীরা। গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি (সুপ্রিম কোর্ট বার) ভবনে সাধারণ আইনজীবী ব্যানারে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। আইনজীবীরা হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর না করার জন্য সরকারকে হুঁশিয়ারি দেন। তারা বলেন, এতে বিচার বিভাগ দুর্বল হবে। এ উদ্যোগ থেকে সরে না দাঁড়ালে দুর্বার আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তারা। কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্ট বারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন, আইনজীবী আতিয়ার রহমান, মোকছেদুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান খান প্রমুখ।

হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থানান্তরের উদ্যোগ না নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম। এতে বলা হয়, সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মূল আসন রাজধানী ঢাকায় থাকবে। হাইকোর্ট বেঞ্চ অন্যত্র বসানো গেলেও সেটি অস্থায়ী। এর স্থায়ী স্থানান্তর সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়, আলাদা বেঞ্চ স্থাপন করা হলে একমুখী আইন প্রয়োগে ভিন্নতা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। এতে সর্বোচ্চ আদালতের একত্ব ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবেদনে আরও বলা হয়, বিভাগীয় শহরে বিচারপতি, স্টাফ, অবকাঠামো ও  নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য ও জটিল। এতে রাষ্ট্রের অর্থ, সময় ও দক্ষতার অপচয় হবে। স্থানীয় প্রভাব, সামাজিক চাপ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিচারকার্যে প্রভাব ফেলতে পারে।