সম্ভাবনা-সংশয়ের দোলাচলে গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা

গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে কাতারের দোহায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরোক্ষ যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে এবং কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। তবে, আলোচনায় কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও, উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি এখনো অর্জিত হয়নি। মানবিক সাহায্য বিতরণ, জিম্মি মুক্তি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহায় গত রবিবার রাতে ও সোমবার সকালে দুটি পরোক্ষ আলোচনা হয়। তবে সেই দুই বৈঠকে তেমন কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়নি। গতকাল রাতেই তৃতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আলজাজিরা বলছে, এই আলোচনাগুলো প্রাথমিকভাবে যুদ্ধবিরতির একটি সাধারণ কাঠামো তৈরির দিকে মনোনিবেশ করছে। কাঠামো চূড়ান্ত হলে জিম্মি ও বন্দিবিনিময় এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। তবে, মানবিক সাহায্য বিতরণের প্রক্রিয়া নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এখনো কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। হামাস জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রচলিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের দাবি জানিয়েছে, যা ইসরায়েলের সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের বিকল্প। এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কারণ ত্রাণ নিতে গিয়ে অন্তত ৭৪৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

হামাস যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে : মার্চে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের আগে ইসরায়েলি সেনার অবস্থানে ফিরে যাওয়া, গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বন্ধ করা এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের দাবি করা পরিবর্তনগুলো ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি হামাসের ‘পূর্ণ নির্মূল’ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন, যদিও ‘পূর্ণ বিজয়’-এর সংজ্ঞা তিনি স্পষ্ট করেননি।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবে ইসরায়েলের সম্মতির কথা জানিয়েছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এই সপ্তাহেই হামাসের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্ভব। গতকাল ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, যেখানে গাজার যুদ্ধবিরতি ছাড়াও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে, যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো গাজার সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে সাফল্য প্রদর্শন করা। তিনি জিম্মিদের মুক্তি এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে নিজের প্রভাব জোরদার করতে চান। তবে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। নেতানিয়াহু বর্তমানে প্রতারণা ও ঘুষের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

যুদ্ধবিরতি আলোচনার পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো হামাস ও ইসরায়েলের বিপরীতমুখী দাবি। হামাস স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্তে জিম্মি মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেখানে ইসরায়েল হামাসকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যে অটল। এ ছাড়া, গত মার্চে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা এবং সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় ৮২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনা আলোচনার পথে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষক ওমর রহমান বলেছেন, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য জিম্মি মুক্তি, যুদ্ধের অবসান নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে না। একইভাবে, মেরাভ জনজিয়েন বলেছেন, ইসরায়েলের বোমা হামলার ধরন এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। গাজার সাংবাদিক ইয়াসির আল বান্না জানিয়েছেন, গাজার জনগণ এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। অর্ধেক মানুষ হতাশ আর বাকিরা মনে করেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় প্রায় ৫৭ হাজার ৩৩৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। জাতিসংঘ এই হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। গাজার অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং হাসপাতালগুলোর অর্ধেক বন্ধ রয়েছে। মানবিক সাহায্য বিতরণে বাধার কারণে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাম্পের আশাবাদ এবং হামাসের ইতিবাচক সাড়া সত্ত্বেও, ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে কার্যকর হলেও, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। গাজার জনগণের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা এখন এই আলোচনার সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে।