ইতিহাসে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ডুবে গেছে ফেনীর বিভিন্ন এলাকা। টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ফেনী শহর। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের ১৫টি জায়গার ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ফুলগাজীর ও পরশুরামের ২৫াট গ্রাম। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফুলগাজী ও পরশুরামে ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে আশ্রয় নিয়েছে ১৩৩ জন। বিলোনিয়া সীমান্তের ভারতের অংশে একটি বেড়িবাঁধ কেটে দিয়েছে সেখানকার স্থানীয়রা। সেই কাটা জায়গা দিয়ে খুব বেশি পরিমাণে পানি না এলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় শঙ্কাও থাকছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে। গত বছর আগস্টের ভয়াবহ বন্যার শঙ্কা ফিরে আসছে তাদের মনে।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৪৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে; যা জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ। রাত ১২টায় ফেনী আবহাওয়া অফিস জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় গড় বৃষ্টিপাত কিছুটা বেড়েছে। মঙ্গলবার রাত ১২টা অবধি জেলায় ৪৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ বুধবারসহ আগামী দুদিনও ভারী বর্ষণের শঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিবৃষ্টি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নদীর পানির বিপদসীমা অতিক্রম করায় ফেনী শহরসহ ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টি ও উজানের পানির ঢলে এসব নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৬৭ সেন্টিমিটার ওপর বইছিল।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র রাতে জানায়, তিনটি নদীর ১৫টি জায়গার ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকছে তবে ভাঙন রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফুলগাজী বাজারের শ্রীপুর রোডে মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে কয়েকটি দোকান নদীতে বিলীন হয়েছে। পরশুরামের মির্জানগর ইউনিয়নে সিলোনিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপর প্রবাহিত হওয়ায় মেলাঘর, গদানগর ও মনিপুরসহ অন্তত ছয়টি গ্রাম প্লাবিত। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৪টার পর থেকে পানির উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সন্ধ্যা নাগাদ অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। ফুলগাজী বাজারের ব্যবসায়ী তারেক বলেন, ‘দোকানে পানি ঢুকে সব মালামাল ভিজে গেছে। গত বছরের বন্যার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, এবার আবার নতুন ক্ষতি হলো।’
এদিকে ফেনী শহরের এসএসকে রোড, একাডেমি রোড, পাঠানবাড়ী রোড, নাজির রোড, মিজান রোড, কলেজ রোড, শান্তি কোম্পানি রোড, কদলগাজী রোড ও পেট্রোবাংলা এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। শহরের অধিকাংশ বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে আসবাবপত্র, গৃহস্থালি সামগ্রী ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে যানবাহনের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বিকল হয়ে যাওয়ায় যাত্রী ও চালকরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা হাঁটু থেকে কোমর পানির মধ্য দিয়ে স্কুলে যেতে ব্যর্থ হলেও পরীক্ষার্থীরা রিকশা ও ভ্যানে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। অনেক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফেনী পৌর হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা এবং খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বন্যার শঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরশুরামের মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সিলোনিয়া নদীর পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে। গ্রামের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। গত বছরের বন্যার ক্ষতি এখনো পুষিয়ে উঠতে পারিনি, এবার আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছি।’ কৃষকরা জানান, আমন ধানের বীজতলা ও ফসলি জমি পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেনী উজানে ত্রিপুরা থেকে আসা পানি ও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের গ্রেজ রিডার নেপাল সাহা রাত ১২টার দিকে জানান, মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, ফুলগাজী ও পরশুরামের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। ফেনী পৌর প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, পৌরসভার সাতটি টিম পানি নিষ্কাশনের কাজ করছে। তবে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খালের দখলমুক্ত না হওয়ায় পানি নামছে ধীরগতিতে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম জানান, কহুয়া নদীর বাঁধের ওপর দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকছে, তবে এটি এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। প্রশাসনের পরামর্শে বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা : ফেনী ছাড়াও খুলনা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও রাঙ্গাবালীতে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। খুলনায় ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরীর সড়ক ও বাসাবাড়ি তলিয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের ৮২৪ কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নোয়াখালী পৌরসভায় জলাবদ্ধতায় দোকানপাট ও বাসাবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং খাল দখলের সমস্যা তীব্র। পটুয়াখালীতে ২১৫.১ মিলিমিটার বৃষ্টিতে মাছের ঘের ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। রাঙ্গাবালীতে ২২৪.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে আমন বীজতলা ডুবে কৃষকরা ক্ষতির মুখে। দুমকিতে পায়রা নদীর জোয়ারে নিম্নাঞ্চল পানিবন্দি এবং ফসল ও মৎস্য খামারে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়া ও সতর্কতা বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় অতিভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিস জানায়, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর ও নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত জারি রয়েছে। মাছধরা ট্রলারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেনীতে আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যার নিয়মিত বুলেটিনে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় ২৪ ঘণ্টায় ৪৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ‘ফেনীর ইতিহাসে ২৪ ঘণ্টায় এটি রেকর্ড বৃষ্টিপাত। সেই সঙ্গে এ মৌসুমে ২৪ ঘণ্টায় দেশেরও সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড এটি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ঘণ্টা ফেনীর মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীগুলোর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীগুলোর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজমান থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি একই অবস্থানে আছে। ফলে সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। লঘুচাপের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগেই গতকাল দিনভর কমবেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে; যা বুধবারও অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘অবস্থানগত কারণে লঘুচাপটি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগরে ঝুলে আছে বিধায় দিনভর বৃষ্টি হয়েছে। আজকের পর বৃষ্টি কমে যাবে বলে আশা করছি।’
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত লঘুচাপটি একই এলাকায় অবস্থান করছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এজন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
অধিদপ্তরের গতকাল সন্ধ্যার নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এ সময় সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।