আজ ৯০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। গত সোমবার তিনি ১৪টি দেশের পণ্যে নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। আগামী ১ আগস্ট থেকে এ শুল্ক কার্যকর হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য আলোচনার সুযোগ উন্মুক্ত রেখেছেন তিনি। এখন বাংলাদেশের দরকষাকষির দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা।
গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এই শুল্কের মূলনীতি হলো যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি যত বেশি, সেই দেশের ওপর শুল্কের হারও তত বেশি। এ নীতির আলোকে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এমন শুল্ক ঘোষণার পর বিশ্ব জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে ৯ এপ্রিল মার্কিন প্রশাসন এ উদ্যোগ ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করে। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দরকষাকষির উদ্যোগ নেওয়া হয়। আজ সেই ৯০ দিনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্ত ছিল। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। কিন্তু এসব বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ এলডিসি দেশ হিসেবে শুল্কছাড় দাবি করেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এলডিসি দেশগুলোকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কোনো নজির নেই। ফলে শুল্ক পুনর্বিবেচনা করে নতুন করে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করে এবং অশুল্ক বাধা কমায়, তাহলে এ শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ বিধান চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তবে এ শর্ত পালন বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া সুবিধা অন্য কোনো দেশকে দেওয়া যাবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও সেই দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। এমন আরও কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ডব্লিউটিওর সদস্য এবং এর নিয়ম মানতে বাধ্য। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এসব শর্ত মেনে চলা বাংলাদেশের জন্য সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ককে পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকষাকষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দরকষাকষির জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। আজ তার সঙ্গে যোগ দেবেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তবে এ দরকষাকষি সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের মতো প্রধান অংশীজনদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক মোকাবিলায় যেসব কমিটি গঠন করেছে, তাতে কোনো বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। এজন্য তারা লবিস্ট নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। দরকষাকষি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সেই দরকষাকষিতে সরকারের বাইরের অংশীজন বা বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। ফলে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি করে বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ কী কী উদ্যোগ নিতে পারে, তা তাদের জানাতে হবে। এ শুল্ক অব্যাহত থাকলে রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্র্যান্ড ক্রেতারা এ শুল্কের দায়ভার নেবে না। ফলে তারা স্বল্পমূল্যের বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবে। স্বল্পমেয়াদে সমস্যা না হলেও মধ্যমেয়াদে অনেক ক্রেতা চীন, ভিয়েতনাম বা ভারতের দিকে চলে যেতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ শুল্ক হ্রাস করা না গেলে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। গতকাল সচিবালয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আলোচনার পথ উন্মুক্ত রয়েছে, হয়তো কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’ বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমাতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে বোয়িং বিমান এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
গতকাল সচিবালয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ নিয়ে আলোচনার জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। বাণিজ্য সচিবও যাচ্ছেন। আমরা আশা করছি, আজকের বৈঠকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়ে আলোচনা হবে।’
ট্রাম্পের চিঠি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চিঠিতে যেসব ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমরা আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। গম, সয়াবিন, বিমান, অন্যান্য যন্ত্রপাতি এগুলোর ওপর শুল্কহার এমনিতেই খুব কম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে হলে আমাদের কিছু ছাড় দিতে সম্মত হতে হবে।’
ব্যবস্যীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শুধু বাংলাদেশকে এককভাবে শুল্ক আরোপ করেনি, প্রতিযোগী অন্যান্য দেশও এর আওতায় রয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক হলেও আলোচনা ও সমঝোতার জন্য পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। আজ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক হবে। আশা করা যায়, একটি সুন্দর সমাধান পাওয়া যাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন তাদের নাগরিকদের চাহিদা বিবেচনা করে সহজ বাণিজ্যনীতি বজায় রাখতে উদ্যোগ নেবে।’
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক ক্রেতা। এ শুল্কের কারণে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য মারাত্মক আঘাত। অভ্যন্তরীণ সমস্যার সঙ্গে এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা যোগ হচ্ছে। তবে সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছে যে, তারা সমাধানের উদ্যোগ নেবে। তাই বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হলেও দুশ্চিন্তার নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য উপদেষ্টা, বাণিজ্য সচিব ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। রপ্তানিমুখী শিল্প-মালিকদের সমস্যা ও সুবিধা তাকে জানানো প্রয়োজন। তিনি যখন সময় দেবেন, তখনই তার সঙ্গে দেখা করতে প্রস্তুত আছি। তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত ও স্বনামধন্য। আশা করি, তার উদ্যোগে সমস্যার সমাধান হবে।’
মার্কিন শুল্কনীতি প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হবে? জবাবে মাহমুদ হাসান বলেন, ‘এখানেই আমরা উদ্বিগ্ন। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমাদের শুল্কহার বেশি হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। রপ্তানি আদেশ হারাব। তাই সরকরের কাছে আমাদের আবেদন, প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে শুল্কহার সমান রাখা হোক। একই হারে শুল্ক থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সমস্যা হবে না।’
বাংলাদেশের পাশাপাশি একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পণ্যে ২৫ শতাংশ, মিয়ানমার ও লাওসের পণ্যে ৪০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, মালয়েশিয়া ও তিউনিসিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ, বসনিয়ার পণ্যে ৩০ শতাংশ, সার্বিয়ার পণ্যে ৩৫ শতাংশ, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ এবং কাজাখস্তানের পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে এখনো অনেক দেশের শুল্ক পরে ঘোষণা করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য। আগে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কহার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ, এখন তা দ্বিগুণেরও বেশি। এই আকস্মিক ও ব্যাপক শুল্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শুল্ক আলোচনায় নিয়োজিত বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা ইতিবাচক ফল অর্জন করতে পারেননি। ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।’