গত বছর বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এমন খবরে দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপের অডিও রেকর্ডিং যাচাই করে এ তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
বিবিসির অনুসন্ধানী শাখা ‘বিবিসি আই’ ও বিবিসি বাংলা এ অনুসন্ধান চালিয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘বিবিসি আই’-এর যাচাইকৃত ওই অডিওতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘তারা (নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য) যেখানেই তাদের (আন্দোলনকারী) পাবেন, গুলি করবেন।’
মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে গুলির নির্দেশ দেওয়া শেখ হাসিনার ফোনালাপের আন্তর্জাতিক ভেরিফিকেশন মামলার বিচারে স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। এটিকে ডকুমেন্ট আকারে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
ফাঁস হওয়া অডিওতে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে গুলি চালানোর বিষয়ে শেখ হাসিনার ফোনালাপ নিয়ে বিবিসির ভেরিফিকেশনের বিষয়ে গতকাল বুধবার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এমন তথ্য জানান।
একজন অজ্ঞাতনামা জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিওটি চলতি বছরের মার্চ মাসে অনলাইনে ফাঁস হয়। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ, যা থেকে বোঝা যায় শেখ হাসিনাই সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অডিওটির বিষয়ে অবগত একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, গত বছরের ১৮ জুলাই যখন ফোনালাপটি হয়, তখন শেখ হাসিনা ঢাকার গণভবনে (তার সরকারি বাসভবনে) ছিলেন। তখন
আন্দোলন তুঙ্গে ছিল। ফোনালাপের পরের দিনগুলোতে ঢাকায় সেনাবাহিনী ব্যবহার করে এমন প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয় বলে পুলিশের নথি থেকে বিবিসি জানতে পেরেছে।
বিবিসির পরীক্ষা করা রেকর্ডিংটি বাংলাদেশ সরকারের টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) রেকর্ড করা শেখ হাসিনার অসংখ্য ফোনালাপের একটি। তবে রেকর্ডিংটিকে ফাঁস করেছে তা স্পষ্ট নয়।
ফাঁস হওয়া ১৮ জুলাইয়ের রেকর্ডিংটি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে। বিবিসিও স্বাধীনভাবে এটির যাচাই করেছে। তারা রেকর্ডিংটি অডিও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ারশট’-এর কাছে পাঠায়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, রেকর্ডিংটিকে সম্পাদনা বা বিকৃত করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এটির কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও অত্যন্ত কম।
ইয়ারশট আরও জানায়, রেকর্ডিংটিতে ইলেকট্রিক নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি (ইএনএফ) শনাক্ত করা গেছে, যা প্রমাণ করে অডিওটি বিকৃত করা হয়নি। তারা শেখ হাসিনার বক্তব্যে ছন্দ, স্বর ও শ্বাসের শব্দও যাচাই করেছে এবং ধারাবাহিক নয়েজের স্তরও শনাক্ত করেছে। অডিওতে কৃত্রিম পরিবর্তন আনার প্রমাণও খুঁজে পায়নি তারা।
গাজী তামিম বলেন, ‘শেখ হাসিনার বেশ কয়েকটি অডিও এর আগে পুলিশের ক্রাইমস ইনভেস্টিগেশন টিম পরীক্ষা করেছে। তারাও ফরেনসিক সত্যতা পেয়েছে, এসব ফোনালাপ হাসিনারই। তারপরও আন্তর্জাতিক সংস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খু বিশ্লেষণ করে যে রিপোর্ট দিয়েছে তা মামলার অভিযোগ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে।’
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার আদেশ দেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। শেখ হাসিনা ছাড়াও এ মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে কমপক্ষে ৫২ জন নিহত হন বলে বিবিসি আইয়ের একটি অনুসন্ধানে বলা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ড সেদিন ঘটেছিল, যেদিন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে টানা ৩৬ দিন ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পাড়ি জমান।