বাংলাদেশের পণ্যে গত ২ এপ্রিল ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এক সপ্তাহ পর তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছিল দেশটি। এই ৯০ দিনের মধ্যে দেশটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে আসার শর্ত ছিল। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে বেশ ঢিলেমি ছিল বলে মনে হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) থেকে গত এপ্রিলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ওপর সাত পৃষ্ঠার একটি অধ্যায় ছিল। মার্কিন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, সে বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল। বাংলাদেশের উচিত ছিল ওই প্রতিবেদনের একটি যথাযথ জবাব দেওয়া। সেটা না করে বাংলাদেশ বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন ১০০ পণ্যে শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া, বিভিন্ন পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের যেসব বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী তা উল্লেখ করে ইউএসটিআরকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। এ ক্ষেত্রে দেশের যেসব অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তাদের সহায়তা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে ইউএসটিআরের প্রতিবেদনের বিষয়ে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করে একটি জবাব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। ফলে ৯০ দিনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ২ শতাংশ বলা যেতে পারে। কারণ প্রথম প্রতিবেদনে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার কথা বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ ৯০ দিনে সেটি মাত্র ২ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করতে সক্ষম হয়েছে।
তাছাড়া বাংলাদেশ একটি অনুমানের ভিত্তিতে ধারণা করেছিল যে, পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র এক বছর পিছিয়ে দেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-উপাত্ত ছিল না। বলা হচ্ছে যে, ইউএসটিআরের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছিলেন পাল্টা শুল্কের বিষয়টি এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হবে। এটি কোনো যুক্তি হতে পারে না। কারণ এখানে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর। যে প্রশাসন আন্তর্জাতিক কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তার সঙ্গে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই আলোচনা করা উচিত।
নতুন করে যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন, সেটির সঙ্গে আগের ১৫ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হবে। সব মিলে মার্কিন বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হলে ৫০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে যাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকা কঠিন হবে। কারণ সাকল্যে তাদের শুল্ক মাত্র ২০ শতাংশ। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হচ্ছে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে, ভিয়েতনাম সেসব আইটেমে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কি না। বাংলাদেশের সব অর্ডার যে একবারে ভিয়েতনামে চলে যাবে, তেমনটি নয়। আর ভিয়েতনামে অর্ডার গেলেই যে তারা তা সরবরাহ করতে পারবে, তেমনটিও নয়। কিন্তু এই বাড়তি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি যে একটা ধাক্কা খাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাধারণত কোনো বাজারে প্রতি বছর রপ্তানিতে একটি প্রবৃদ্ধি হয়। নতুন আরোপিত শুল্ক অব্যাহত থাকলে সেই প্রবৃদ্ধি দূরের কথা, বিদ্যমান রপ্তানি ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া ভারত ও পাকিস্তানও আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে শুল্কহার কেমন হবে, তা এখনো অজানা। ফলে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিপরীত কিছু ঘটনাও ঘটতে পারে। তা হচ্ছে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশের শুল্ক বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এসব দেশ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোশাক আমদানি করে। ফলে সেখানকার ক্রয়াদেশগুলো বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ আছে।
সার্বিকভাবে মার্কিন শুল্কের বিষয়ে এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ এখনো আলোচনা চলমান। তাছাড়া মার্কিন প্রশাসন শুধু ১৪টি দেশকে চিঠি দিয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে, সেটি দেখার দরকার আছে। সব মিলে বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, ঢাকা কার্যালয়