যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের ধারা ভেঙে রাশিয়ার প্রতি অনেকটাই সহনশীল মনোভাব দেখিয়েছেন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রতি নানা সময় আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যও করেছেন এই রিপাবলিকান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে পুতিনের ওপর বিরক্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে, রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। যা তার অতীত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। সব মিলিয়ে তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন ট্রাম্পের পুতিন-মোহ ভঙ্গ হতে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে যে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, সেই নির্বাচনে তাকে জয়ী করতে রাশিয়ার কলকাঠি নাড়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পরে মিলেছিল। বলা হয়ে থাকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশেই রুশ সামরিক গোয়েন্দা, হ্যাকাররা সেই তৎপরতা চালিয়েছিল। ১১ জন রুশ নাগরিকের নাম ওয়ান্টেড হিসেবে এখনো রয়েছে এফবিআইর ওয়েবসাইটে। পশ্চিমা দুনিয়ার রাষ্ট্রনেতাদের কাছে চক্ষুশূল হলেও পুতিন বরাবরই ছিলেন ট্রাম্পের কাছে আদরণীয়। গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দাবি করেন, পুতিন ইউক্রেনে শান্তি চান। অথচ ২০২২ সালে পুতিনই এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। ট্রাম্পের বক্তব্যটি ছিল এ রকম আমি বিশ্বাস করি যে তিনি শান্তি চান। কেন বিশ্বাস করেন, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আমি তাকে খুব ভালোভাবে চিনি। হ্যাঁ, আমি মনে করি তিনি শান্তি চান। যদি তিনি না চাইতেন, তাহলে আমাকে বলতেন।
ট্রাম্পের ওই কথায় অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে উঠেছিল। কিন্তু সেই ট্রাম্পের এখনকার কথায় অন্য সুর পাওয়া যাচ্ছে। পুতিনের প্রতি নাখোশ হওয়ার কথা গত কিছুদিন ধরেই বলছেন ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনালাপের পর তার এমন মনোভাব আরও বেশি করে প্রকাশ পাচ্ছে। গত মঙ্গলবার নিজের মন্ত্রীদের নিয়ে সভার পর ট্রাম্প আরেক কাঠি বেড়ে বলেন, যে ব্যক্তিটিকে তিনি এতদিন ধরে ছাড় দিয়ে আসছেন, তিনি তার যোগ্য নন। ট্রাম্প বলেন, যদি আপনি সত্যটা জানতে চান, তাহলে বলব, পুতিন আমাদের ওপর অনেক বাজে বিষয় চাপিয়ে দেন। তিনি সব সময় খুব ভালো, কিন্তু এর কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। শুধু যে পুতিনকে নিয়েই ট্রাম্পের মনোভাব পরিবর্তন, তা নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও তার অবস্থান বদলে যাচ্ছে। এবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউজে ডেকে নিয়ে যেভাবে ঝেড়েছিলেন ট্রাম্প, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের গণ্ডিও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর জন্য জেলেনস্কিকে দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প; পুতিনের সঙ্গে তিনি কেন বোঝাপড়া করে নিচ্ছেন না, তা নিয়েও ক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ওয়াশিংটনকে অস্ত্র-অর্থ দিতে পারবে না। কিন্তু পুতিনের প্রতি মনোভাব বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই সপ্তাহে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ পুনরায় শুরু করেছেন ট্রাম্প। যদিও তিনি বলছেন, এটা তার প্রশাসনের অন্যদের সিদ্ধান্ত। তবে এটা দেখা যাচ্ছে যে এখন তিনি যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনকে দায়ী করা বন্ধ করে দিয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর জন্য এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনেরও এক চোট সমালোচনা তিনি করতেন। কিন্তু মঙ্গলবার তিনি নিজ থেকেই ইউক্রেনের যোদ্ধাদের সাহসের প্রশংসা করেছেন। এটা এই ইঙ্গিত দেয় যে আগে ইউক্রেনকে অর্থ দেওয়া অপচয় মনে করলেও এখন তা আর মনে করছেন না তিনি। যার ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে- ট্রাম্প আসলে কি চান? তবে এসব ঘটনা প্রবাহ থেকে কেউ যদি ভাবেন যে ট্রাম্প এখন সত্যিকারেই পুতিনবিরোধী হয়ে গেছেন কিংবা তিনি এখন পুরোপুরি ইউক্রেনের পক্ষে, তাহলে তা ভুল হবে। ট্রাম্প গত ১০ বছরে বারবার বোঝাতে চেয়েছেন যে বিশ্ব মঞ্চে তিনি নিজেকে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ হিসাবে দেখাতে চান। এটাকে ‘পাগল তত্ত্ব’ কিংবা ‘ক্ষ্যাপাটে তত্ত্ব’ যাই বলা হোক না কেন। পুতিনের পক্ষে এত দিন ধরে ওকালতি করে আসা ট্রাম্প সম্প্রতি নিজের জন্মদিনে তার কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পরও এমন কোনো ইঙ্গিত দেননি যে রুশ প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে তিনি কোনো চাপ দিচ্ছেন। এখন পুতিনের সমালোচনা করে তার বক্তব্যগুলো পুতিনের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
তবে পুতিনকে নিয়ে তার প্রশাসনের নীতি বদলের কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং মঙ্গলবারই রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন, যার প্রতি সিনেটে উভয় দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্যের সমর্থন ছল। ট্রাম্প যদি সত্যিই পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানতে চান, তবে সেই পথটি তার জন্য খোলাই রয়েছে, তবে তিনি এখনো সে পথে যাচ্ছেন না। ট্রাম্প পরোক্ষভাবে পুতিনের নরম সমালোচনার কৌশলই নিচ্ছেন। তাতে বোঝা যাচ্ছে, চরম সমালোচনার তাসটি তিনি খেলতে চাইছেন না। ২০২২ সালে যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তখন ট্রাম্প ইউক্রেনে রাশিয়া আক্রমণকে ‘ভয়াবহ’ বলার মতো পর্যায়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর তিনি যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে, তখন ইউক্রেন আক্রমণের জন্য পুতিনের ‘প্রতিভা’ ও ‘চতুরতা’র প্রশস্তি গেয়ে নিজের সমালোচনা তৈরি করেন দেশে। প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্পের আজকের পরিবর্তন কী আগের মতোই ক্ষণস্থায়ী প্রমাণিত হবে? সেটা হতে পারে। কিন্তু এমন কিছু লক্ষণও রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি নাও হতে পারে। প্রথমত, ট্রাম্প হয়তো এই উপলব্ধিতে আসছেন যে ইউক্রেনে তার লক্ষ্যগুলো পুতিনের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে মিলছে না।
ট্রাম্প সব সময়ই জিততে চান। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে এক দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই শান্তি চুক্তিটি এলে কেমন হবে, তা নিয়ে তিনি খুব বেশি ভাবেননি। ইউক্রেনকে বিশাল ছাড় দিতে রাজি করিয়েছেন তিনি, কিন্তু পুতিন এমন কোনো ইঙ্গিত দেননি যে তিনি ইউক্রেন জয় করা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে সত্যিই একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। মঙ্গলবার ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো কেবল পুতিনের প্রতি চরম বিরক্তির প্রকাশই ছিল না, সেগুলো রাশিয়ার আচরণের প্রতি গভীর হতাশার প্রতিফলন বলেও মনে করা যায়।
ট্রাম্প হয়তো এখন মনে করছেন যে যুদ্ধবিরতির চুক্তির কথা বলে পুতিন তাকে বোকা বানিয়েছেন। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুসকে যখন ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে এখনকার বক্তব্যের ফারাক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্প একজন খোলা মনের মানুষ, তবে মোটেই অনভিজ্ঞ নন। তিনি কী অর্জন করতে চান, সে সম্পর্কে তার ধারণা স্পষ্ট। আমরা এটাই দেখে আসছি। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর ইউক্রেনে ব্যাপক আকারে ড্রোন হামলা চালান পুতিন। সেটাও ট্রাম্পের উপলব্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে পারে। অন্য যেকোনো রাষ্ট্রনেতার চেয়ে পুতিনকে নিঃসন্দেহে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়ানো কেবল নৈতিক বিষয়ই নয়, বাস্তব রাজনীতিরও বিষয়। আর এটাই হয়তো ট্রাম্পের কাছে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, কিন্তু কতটা বদলাবে, তা সময়ই বলে দেবে।