ফেনীতে কমছে পানি বাড়ছে ভোগান্তি

ফেনীতে বৃষ্টি ও নদীর পানির পরিমাণ কমলেও বন্যা পরিস্থিতির কারণে হাজার হাজার মানুষ এখনো ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা বাঁধভাঙা পানি ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে পড়ায় ১১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩৪ হাজার ৬০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২৩টি স্থান ভেঙে যাওয়ায় সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ফুলগাজীতে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে কারেন্ট জালে জড়িয়ে নুরুল আলম (৬২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

গত সোমবার থেকে ভারী বর্ষণের কারণে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২৩টি স্থান ভেঙে যায়। বুধবার থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করায় পরশুরাম ও ফুলগাজীতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ছাগলনাইয়া পৌরসভার ১০টি গ্রাম এবং ফেনী সদরের কাজিরবাগ, মোটবী, ছনুয়া, ফাজিলপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মুহুরী নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ১.৯৩ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফেনীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিস জানায়, শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং বৃষ্টিপাত ক্রমেই কমছে। ফলে শনিবারের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। পরশুরামে প্রায় ৫০টি ঘরবাড়ি পানিতে ধসে পড়েছে এবং সড়ক ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এলাকার পুকুর ডুবে মাছ ভেসে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বন্যার কারণে ফেনী-ফুলগাজী ও ফেনী-ছাগলনাইয়া আঞ্চলিক সড়কে ১ থেকে ২ ফুট পানি প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় পানিবন্দি মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। নিরাপদ পানির সংকটে শিশু ও বয়স্করা বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ফুলগাজীর দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা রেজিয়া বেগম বলেন, ‘গত বছরের বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার পানিতে ডুবতে হলো। সব জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। বাঁধ ভাঙন এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে।’ উত্তর শ্রীপুরের আলী আজ্জম বলেন, ‘বাঁধের ভাঙন স্থানে তীব্র স্রোতে পানি ঢুকছে। বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সমস্যায় আমরা দিশেহারা।’

ছাগলনাইয়ার পুষ্পিতা রানী অভিযোগ করেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়সারা কাজের জন্য প্রতি বছর বাঁধ ভাঙছে। টেকসই বাঁধই আমাদের একমাত্র সমাধান।’

প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্থানীয়রা বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা প্রদান করছে। ফেনী জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, চার উপজেলার ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘পানির চাপ কমায় বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা নেই। পানি কমলেই ভাঙনকবলিত স্থান মেরামত করা হবে।

মাছ ধরতে গিয়ে মৃত্যু : বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে ফুলগাজীর বন্দুয়া দৌলতপুর এলাকায় নুরুল আলম নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের পর তিনি বাড়ির পাশে কারেন্ট জাল তুলতে গিয়ে জালে আটকে ছটফট করে মারা যান। স্থানীয়রা বিকেলে তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের প্রতিবেশী ফখরুল আলম স্বপন জানান, নুরুল আলম জ্বরে ভুগছিলেন এবং সম্প্রতি স্ট্রোক করেছিলেন। ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, ‘এমন মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়।’

গোমতীর পানি কমছে, ফিরছে স্বস্তি : কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে গোমতী নদীর পানি দ্রুত বাড়লেও এখন তা কমতে শুরু করেছে। এতে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে বন্যার পানিতে জেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় ১৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির সবজি, আউশ ধান ও রোপা আমন বীজতলার ক্ষতি হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি।

গত কয়েক দিন বন্যার আশঙ্কায় অনেকে নদী তীরবর্তী বাড়ি ছেড়ে বেড়িবাঁধে বাঁশ ও ত্রিপলের ঝুপড়ি তৈরি করে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কেউ কেউ স্বজনদের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি বন্ধ থাকায় গোমতীর পানি দ্রুত কমছে, ফলে অনেকে নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।

সংরাইশ এলাকার রিপন মিয়া বলেন, ‘নদীর চরে বসবাস করি। পানি বাড়লে আমাদের উৎকণ্ঠা বাড়ে। ছেলেসন্তান নিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়িতে ছিলাম। আজ পানি কমায় বাড়িতে ফিরছি।’

আমতলী এলাকার কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘চরে তিন একর জমিতে সবজি চাষ করেছিলাম। ফলন ভালো ছিল, কিন্তু ঢলে সব তলিয়ে গেছে। প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষির জন্য ঋণ নিয়েছিলাম, এখন কীভাবে শোধ করব জানি না।’

বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর হোসেন বলেন, ‘পানি কমছে, তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত।’

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, বৃষ্টি থেমেছে, উজান থেকে ঢলও কমেছে। শুক্রবার বিকেল ৩টায় গোমতীর পানি ৮.৫৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল, যা বৃহস্পতিবার ছিল ৯.৬৮ মিটার। বিপদসীমা ১১.৩ সেন্টিমিটার।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবেদ আলী বলেন, ‘জেলায় এখনো পূর্ণাঙ্গ বন্যা হয়নি, তবে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। গোমতীর পানি কমছে, দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা প্রয়োজন।’

তিনি জানান, জেলা প্রশাসন ৫৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আইউব মাহমুদ বলেন, ‘গোমতীর চরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি টাকার ক্ষতি ধরা হচ্ছে। পানি পুরোপুরি নামলে সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে।’

গত বছর ২২ আগস্ট গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবার পানি বাড়তেই এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছিল।

যমুনার পানি বাড়ছে : সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জের যমুনাসহ সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রামে যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে শতাধিক বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীতীরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িও ঝুঁকিতে রয়েছে। গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। আখ, পাট, বাদাম, শাকসবজি, কাঁচা মরিচ ও কাউনের ক্ষেত পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ফলে বাজারে শাকসবজি ও কাঁচা মরিচের দাম দুই-তিনগুণ বেড়েছে। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নিম্নআয়ের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বৃষ্টির কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেকে জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

গতকাল সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর মেঘাই ঘাটে ১১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে পানি এখনো বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদরের ভাটপিয়ারি ও বাহুকা, কাজিপুরের নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, খাসরাজবাড়ি, চৌহালীর খাষকউলিয়া, উমারপুর, তেঘরি, কুড়াগাছা, শাহজাদপুরের গোপালপুর, ধীতপুর, শ্রীপুর এবং বেলকুচির বড়ধুল ও সদর ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য। কাজিপুরের ভেটুয়ায় ১০০টি এবং শাহজাদপুরের ধীতপুরে ২৫টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া কাজিপুরের ফুলজোড়, চরগিরিশ ও ভেটুয়ার কয়েকটি বিদ্যালয় ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ সদরের বর্ণিচরের বাসিন্দা মান্নান জানান, বন্যায় শাকসবজির ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় দাম বেড়ে গেছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, ভাঙন নিয়ন্ত্রণে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নদীতীরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে অস্বাভাবিক বন্যার আশঙ্কা নেই এবং পানি বৃদ্ধির হার শিগগিরই কমে আসবে। তিনি সবাইকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।